মেক ইন ইন্ডিয়ার পর ‘ওনড বাই ইন্ডিয়া’, কীভাবে বদলাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ডিএপি ২০২৬, দেশীয় প্রতিরক্ষা বাজেট, ড্রোন, রুদ্র ব্রিগেড, অশনি প্লাটুন, দেশীয় যুদ্ধজাহাজ ও অপারেশন সিঁদুরের অভিজ্ঞতায় কীভাবে বদলাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

beyond-make-in-india-how-india-is-building-indigenous-defence

নয়াদিল্লি: দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আত্মনির্ভরতার উপর জোর আরও বাড়িয়েছে কেন্দ্র। লক্ষ্য শুধু দেশে বিদেশি অস্ত্র তৈরি করা নয়, বরং অস্ত্রের নকশা, প্রযুক্তি, উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো।

Advertisements

গত কয়েক বছরে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, এখন তা আরও বিস্তৃত পর্যায়ে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ নীতি থেকে শুরু করে সেনা, নৌসেনা ও বায়ুসেনার আধুনিকীকরণ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং দেশীয় যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, একাধিক ক্ষেত্রে একই সঙ্গে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত ঘাটতি, দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং উন্নত মানবহীন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

   

প্রতিরক্ষা কেনাকাটার নিয়মে বড় পরিবর্তন

ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বর্তমানে ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন প্রসিডিওর বা ডিএপি ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে কাজ চলছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর লক্ষ্য হল আত্মনির্ভরতা বাড়ানো, কেনাকাটার সময় কমানো এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা। প্রস্তাবিত ডিএপি ২০২৬-এ দেশীয় ডিজাইন ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশীয় উপাদানের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির জন্য ধাপে ধাপে সরঞ্জাম অধিগ্রহণের মতো পদ্ধতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ কোনও প্রযুক্তি পুরোপুরি চূড়ান্ত হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সেটি সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

Advertisements

দেশীয় সংস্থার জন্য প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ

দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে নির্দিষ্ট বাজার দেওয়ার জন্য মূলধনী অধিগ্রহণের বাজেটের বড় অংশ দেশীয় সংস্থার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে আধুনিকীকরণ বাজেটের ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১,১১,৫৪৪.৮৩ কোটি টাকা, দেশীয় উৎস থেকে কেনাকাটার জন্য নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে দেশীয় বরাদ্দের ২৫ শতাংশ, প্রায় ২৭,৮৮৬.২১ কোটি টাকা, দেশীয় বেসরকারি শিল্প থেকে কেনাকাটার জন্য রাখা হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষেও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে কেনাকাটার জন্য প্রায় ১.৩৯ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ মূলধনী অধিগ্রহণ বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি সংস্থা ছাড়াও বেসরকারি কোম্পানি, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্টআপগুলির জন্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির সুযোগ বাড়ছে।

বিদেশি প্রযুক্তি, কিন্তু উৎপাদন ভারতে

ভারত পুরোপুরি বিদেশি প্রযুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে না। বরং নতুন নীতির একটি লক্ষ্য হল বিদেশি প্রযুক্তি ও সংস্থাকে ভারতে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা। ‘বাই গ্লোবাল, ম্যানুফ্যাকচার ইন ইন্ডিয়া’ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারদের ভারতে সহযোগী সংস্থা এবং উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরির দিকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি অস্ত্র বা যন্ত্রাংশ আমদানির পরিবর্তে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও সাব-সিস্টেমও ভারতে তৈরি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আমদানি নির্ভরতা কমাতে নতুন মেক ব্যবস্থা

প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের এমন কিছু অংশ রয়েছে যেগুলির মূল নকশা ভারতে তৈরি হয়নি, কিন্তু সেগুলি দেশে উৎপাদন করা সম্ভব। এই ধরনের সরঞ্জাম ও সাব-সিস্টেমের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতেও নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি সংস্থাকে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে নিয়ে আসার জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে এমএসএমইগুলির জন্য সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। সরকারের উদ্ভাবন প্রকল্প আইডেক্স এবং এডিআইটিআই-এর মাধ্যমে স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, আইডেক্সের মাধ্যমে শত শত স্টার্টআপ, এমএসএমই এবং উদ্ভাবককে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়নে যুক্ত করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ সালে ৬.৭৩ লক্ষ কোটি টাকার প্রস্তাব

প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের পরিমাণ বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হল ৬.৭৩ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ বা ডিএসি মোট ৫৫টি প্রস্তাবের জন্য প্রায় ৬.৭৩ লক্ষ কোটি টাকার Acceptance of Necessity বা AoN অনুমোদন করেছিল। মার্চ ২০২৬-এ প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও এই সংখ্যা উল্লেখ করেছিলেন। একই অর্থবর্ষে মূলধনী ক্রয়ের ৫০৩টি চুক্তির মূল্য প্রায় ২.২৮ লক্ষ কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে দেশীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, নজরদারি প্রযুক্তি এবং যুদ্ধবিমান সংক্রান্ত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও ডিএসি প্রায় ৩.৬০ লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ প্রস্তাবে AoN দিয়েছিল। এর মধ্যে রাফাল যুদ্ধবিমান, যুদ্ধাস্ত্র এবং উচ্চ-উচ্চতার প্ল্যাটফর্মের মতো প্রকল্প ছিল।

ড্রোন যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীতে বদল

সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলিতে ড্রোনের ভূমিকা দ্রুত বেড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক পরিবর্তনেও প্রভাব ফেলেছে। সেনাবাহিনীতে রুদ্র অল-আর্মস ব্রিগেড, ভৈরব লাইট কমান্ডো ব্যাটালিয়ন, অশনি ড্রোন প্লাটুন এবং নতুন ধরনের আর্টিলারি ইউনিট তৈরির মতো পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সংসদীয় প্রতিরক্ষা কমিটির নথিতেও রুদ্র ব্রিগেড, ভৈরব ব্যাটালিয়ন এবং অশনি ড্রোন প্লাটুন তৈরির কথা উল্লেখ রয়েছে।

অশনি প্লাটুনের লক্ষ্য হল পদাতিক ব্যাটালিয়নের স্তরেই ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়ানো। ২০২৫ সালে পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের মহড়াতেও নতুন অশনি ড্রোন প্লাটুনের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি রুদ্র ব্রিগেডের মাধ্যমে বিভিন্ন অস্ত্র ও বাহিনীকে একই কমান্ড কাঠামোর অধীনে এনে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

নৌসেনায় দেশীয় যুদ্ধজাহাজের গতি

ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্রগুলির একটি হল নৌসেনা। ২০২৬ সালের ২১ জুন কলকাতায় আইএনএস দুনাগিরি, আইএনএস অগ্রয় এবং আইএনএস সংশোধক একসঙ্গে কমিশন করা হয়। তিনটি জাহাজই দেশীয়ভাবে তৈরি। এগুলির নির্মাণে ভারতীয় নৌসেনার ওয়ারশিপ ডিজাইন ব্যুরো, গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স এবং দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলি যুক্ত ছিল। এই তিনটি জাহাজের নির্মাণে ২০০-র বেশি এমএসএমই অংশ নিয়েছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের প্রকল্পে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি শিল্প এবং এমএসএমই-র সমন্বয় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলেই আইএনএস তারাগিরি নৌসেনায় যুক্ত হয়েছিল। জাহাজটির নির্মাণে দেশীয় ইস্পাতও ব্যবহার করা হয়েছে।

অপারেশন সিঁদুরের পর আকাশ প্রতিরক্ষায় নজর

ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণে অপারেশন সিঁদুর একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্ট নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অপারেশনের সময় ভারতীয় বায়ুসেনার একটি এস-৪০০ ইউনিট ৩১৪ কিলোমিটার দূর থেকে পাকিস্তানের একটি স্পেশাল-মিশন বিমান ধ্বংস করেছিল। রিপোর্টে এটিকে ভারতের দীর্ঘতম সারফেস-টু-এয়ার কিল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

অপারেশন চলাকালীন ভারতীয় বায়ুসেনার সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে এই ধরনের সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিবরণ, স্বাধীন বিশ্লেষণ এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্য আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। অপারেশন সিঁদুরের সঙ্গে যুক্ত বায়ুসেনা কর্মীদের জন্য ২০২৫ সালে বিভিন্ন গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ডও দেওয়া হয়েছিল। সরকারি তালিকায় ১৬২টি Mention-in-Despatches for Operation Sindoor-সহ বিভিন্ন সম্মানের উল্লেখ রয়েছে।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি

ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু আত্মনির্ভরতার অর্থ শুধু দেশে অস্ত্র তৈরি করা নয়। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার ব্যবস্থা, মহাকাশভিত্তিক নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, হাইপারসনিক অস্ত্র এবং দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল আক্রমণ প্রযুক্তিতে।

এই কারণে আগামী দিনের বড় প্রশ্ন হবে, ভারত কত দ্রুত শুধু উৎপাদনকারী দেশ থেকে নিজস্ব ডিজাইন, সফটওয়্যার, সেন্সর, ইঞ্জিন, যুদ্ধ ব্যবস্থাপনা এবং মানবহীন প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তি-নির্মাতা হয়ে উঠতে পারে।

সরকারের নীতি এখন দেশীয় কেনাকাটা, বেসরকারি শিল্প, স্টার্টআপ এবং সরকারি গবেষণা সংস্থাকে একই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করার দিকে এগোচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে গবেষণা ও উন্নয়ন, পরীক্ষামূলক পরিকাঠামো, উৎপাদনের গতি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সেনাবাহিনীর প্রকৃত অপারেশনাল প্রয়োজনের সঙ্গে শিল্পের সক্ষমতার সমন্বয়ের উপর।

অর্থাৎ ভারতের প্রতিরক্ষা আত্মনির্ভরতার পরবর্তী ধাপ শুধু ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নয়। লক্ষ্য আরও গভীর, অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তির নকশা থেকে উৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত দেশীয় নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.

Advertisements