এক মাস আগেই মক্কায় (Mecca) দাঁড়িয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছিল সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। চুক্তির মূল বার্তা ছিল, তিন দেশের কোনও একটির উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু চুক্তি সই হওয়ার এক মাসের মধ্যেই সৌদি আরবের উপর হুথি হামলার অভিযোগ এবং মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর ঘটনায় সেই সমঝোতা বাস্তব পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, মঙ্গলবার মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। ড্রোনটি পবিত্র শহরের নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমায় ঢোকার আগেই সেটিকে আটকানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ মক্কার নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে মক্কা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান এবং তুরস্ক বাস্তবে কতটা সামরিক ভূমিকা নেবে।
মক্কা চুক্তির মূল শর্ত কী?
গত মাসে সৌদি আরবের মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তিতে তিন দেশের যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে এবং কোনও সদস্য রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রাখা হয়েছে। চুক্তির সময় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের উপর অপ্ররোচিত হামলা বা ইয়েমেনের যুদ্ধের প্রভাব সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে চুক্তির বিষয়টি কার্যকর হওয়ার কথা। তবে বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর ইসলামাবাদের অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক।
সৌদির উপর হামলা বাড়ছে
গত কয়েক দিনে ইয়েমেনের ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি বাহিনী সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনও হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। এই পাইপলাইনটি সৌদি তেলকে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প পথে লোহিত সাগরের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি সৌদির জ্বালানি রপ্তানি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই মক্কার কাছে ড্রোন আটকানোর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
পাকিস্তান কেন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যাচ্ছে না?
ইসলামাবাদের জন্য সবচেয়ে বড় জটিলতা ইরান। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্ককে সামলে চলা ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হুথি আন্দোলনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালালে পাকিস্তান কার্যত ইরান-ঘনিষ্ঠ একটি শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথি হামলার পর মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কোনও তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ চুক্তির প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিল। অর্থাৎ সৌদির নিরাপত্তার প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন এবং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ, এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখছে পাকিস্তান।
মক্কার ঘটনায়ও পাকিস্তানের অবস্থান সতর্ক
মক্কার কাছে ড্রোন আটকানোর ঘটনার পর পাকিস্তান হামলার নিন্দা করেছে। তবে এখনও সৌদির হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে সেনা পাঠানোর কোনও ঘোষণা দেয়নি। এই অবস্থানকে ইসলামাবাদের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম সদস্য। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চুক্তির সামরিক প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ও তুরস্ক জানিয়েছে, চুক্তিটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করেনি। ফলে কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আমেরিকাও সরাসরি যুদ্ধে নামছে না
সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগী আমেরিকাও এখনও হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নেয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি হামলার অনুমোদন দেননি। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য এবং লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সতর্ক অবস্থানও আরও বোধগম্য হয়ে উঠছে। আমেরিকার মতো বড় সামরিক শক্তিও যখন সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না, তখন ইরানের সঙ্গে সীমান্ত থাকা পাকিস্তান আরও সাবধানে এগোচ্ছে।
চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনই অকার্যকর হয়ে গিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য নেই। চুক্তির সমর্থকদের বক্তব্য হতে পারে, যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানেই প্রতিটি হামলার পর সঙ্গে সঙ্গে সেনা পাঠানো নয়। কূটনৈতিক সমর্থন, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপও তার অংশ হতে পারে। তবে সৌদি আরবের উপর ধারাবাহিক হামলা এবং মক্কার কাছে ড্রোন আটকানোর ঘটনায় চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কথা বলার পরেও পাকিস্তান আপাতত সামরিক পদক্ষেপের কোনও ঘোষণা না করায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
মক্কার ঘটনা তাই শুধু সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাতের নতুন অধ্যায় নয়। এটি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সদ্য তৈরি প্রতিরক্ষা কাঠামো কীভাবে বাস্তবে কাজ করে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হামলা বাড়লে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক সমর্থনের বাইরে কতদূর যেতে প্রস্তুত এবং সেই সিদ্ধান্ত ইরানের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কতটা প্রভাবিত করতে পারে।
Read More: নীতিশের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ আকাশ, হার্দিকের পর নতুন অলরাউন্ডার?
Read More: Jio রিচার্জে বিনামূল্যে এই পরিষেবা! ৪০০০ টাকার সাবস্ক্রিপশন সুবিধা
Read More: ভারতে প্রোটিনের চাহিদা তিনগুণ! দুধ-ডালের সঙ্গে বাড়বে কার্বন নিঃসরণও
