ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তিন দিনের সরকারি সফরে রাশিয়ায় পৌঁছেছেন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠ (Dhiraj Sheth)। বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই সফর চলবে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের রাশিয়া সফরের পর এই প্রথম কোনও কর্মরত ভারতীয় সেনাপ্রধান মস্কোয় সরকারি সফরে গেলেন।
সফরে জেনারেল ধীরজ শেঠের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং সামরিক কর্মসূচি রয়েছে। দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে পেশাদার সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
মস্কোয় গার্ড অব অনার, শ্রদ্ধা অজ্ঞাতনামা সৈনিকের সমাধিতে
রাশিয়া সফরের শুরুতে মস্কোয় জেনারেল ধীরজ শেঠকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তিনি টম্ব অব দ্য আননোন সোলজারে শ্রদ্ধা জানাবেন। রুশ স্থলবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল জেনারেল আন্দ্রেই মর্দভিচেভের সঙ্গেও বৈঠক করবেন ভারতীয় সেনাপ্রধান। এই বৈঠকে দুই দেশের সেনাবাহিনীর পেশাদার সম্পর্ক, প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর আগে গত মাসে নেপাল সফর করেছিলেন জেনারেল ধীরজ শেঠ। নেপালে ভারতীয় সেনাপ্রধানকে সে দেশের সেনাবাহিনীতেও সম্মানসূচক জেনারেল পদ দেওয়া হয়।
রুশ অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
জেনারেল ধীরজ শেঠের রাশিয়া সফরে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত রুশ উৎসের সামরিক সরঞ্জামের যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে থাকা রুশ উৎসের বিভিন্ন সরঞ্জামের মধ্যে অ্যাসল্ট রাইফেল, ট্যাঙ্ক এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে আর্মার্ড কর্পস এবং মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রির বড় অংশ এখনও রুশ উৎসের প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরশীল। ভারত একদিকে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত রুশ সরঞ্জামগুলির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা সচল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন সামরিক প্রযুক্তির প্রস্তাব রাশিয়ার
রাশিয়া ভারতকে কয়েকটি নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাবও দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যান্টসির-এস১এম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিএমপি-৩-এর সর্বশেষ সংস্করণ। ভারতের ফিউচার রেডি কমব্যাট ভেহিকল কর্মসূচি নিয়েও রাশিয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ভবিষ্যতে এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনীর টি-৭২ এবং টি-৯০ ট্যাঙ্কের জায়গায় নতুন প্রজন্মের সাঁজোয়া যুদ্ধযান আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও ভারত ও রাশিয়া যৌথভাবে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। রাশিয়া ভারতের কাছে এসইউ-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং এস-৫০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাবও দিয়ে আসছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়
ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গত কয়েক দশকে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় মূলত অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে যৌথ উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টি-৯০ ট্যাঙ্ক এবং এসইউ-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান ভারতে তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদে চলতি বছরের জুলাইয়ে স্টেলথ ফ্রিগেট আইএনএস তামাল ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশন করা হয়েছে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেও নিয়মিত আলোচনা চলছে। নয়াদিল্লি এবং মস্কোয় ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হয়েছে। সামরিক মহড়ার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
সামরিক মহড়াতেও সক্রিয় সহযোগিতা
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া ইন্দ্রার বিভিন্ন পর্ব দুই দেশের সামরিক যোগাযোগকে আরও সক্রিয় রেখেছে। বিকানেরে ইন্দ্রা মহড়ার পাশাপাশি রাশিয়ার জাপাদ-২০২৫ সামরিক মহড়াতেও ভারত অংশ নিয়েছিল।নৌবাহিনীর ইন্দ্রা মহড়া চেন্নাই এবং বঙ্গোপসাগর এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। থাঞ্জাভুরে বিমানবাহিনীর একটি পৃথক মহড়াও হয়েছে।
ফলে জেনারেল ধীরজ শেঠের বর্তমান রাশিয়া সফরকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রুশ উৎসের সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ যৌথ সহযোগিতা, সবকটি বিষয়ই দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
