ইরান দাবি করেছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর (Hormuz Strait) প্রবেশমুখের কাছে একটি মার্কিন মানবহীন আন্ডারওয়াটার ভেহিকল বা ড্রোন সাবমেরিন আটক করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি মঙ্গলবার এই দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, আটক করা ডিভাইসটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত সবচেয়ে আধুনিক ও বুদ্ধিমান মানবহীন সাবমেরিনগুলির একটি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে সেটিকে ডাইভ-এলডি (Dive-LD) হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ভেহিকল তৈরি করে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থা অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজ।
তবে ইরানের দাবির গুরুত্ব নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। পেন্টাগনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, যে আন্ডারওয়াটার ড্রোনটির কথা বলা হচ্ছে সেটি ইরান আটক করার দাবি জানানোর এক দিনেরও বেশি সময় আগে বিকল হয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন: নতুন শিক্ষাবর্ষে কড়া পদক্ষেপ! অস্ট্রিয়ায় ১৪ বছরের নিচে হিজাবে না
ইরানের দাবি কী?
আইআরজিসি-র নৌবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে তারা মার্কিন ড্রোন সাবমেরিনটিকে আটক করে। আইআরজিসি-র বক্তব্য অনুযায়ী, এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক ও বুদ্ধিমান মানবহীন সাবমেরিন এবং বর্তমানে সেটি ইরানের দখলে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতেও একটি আংশিক ডুবে থাকা আন্ডারওয়াটার ড্রোন দেখা গেছে। এর সামগ্রিক আকৃতি, জলপ্রবেশের ছিদ্র, বিভিন্ন ফাস্টেনিং এবং ছোট স্বচ্ছ মাস্টের মতো কিছু বৈশিষ্ট্য ডাইভ-এলডি-র সঙ্গে মিল রয়েছে। তবে ড্রোনটি ঠিক কীভাবে ইরানের হাতে এল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পেন্টাগনের দাবি সম্পূর্ণ আলাদা
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রোনটি ইরানের হাতে যাওয়ার আগে থেকেই কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। পেন্টাগনের এক মুখপাত্র বলেছেন, এটি ডাইভ-এলডি-র একটি পুরনো মডেল ছিল এবং এতে কোনও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। এমনকি এতে কোনও শ্রেণিবদ্ধ সোনার বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না বলে দাবি করেছে মার্কিন পক্ষ।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, আইআরজিসি আটক করার দাবি করার এক দিনেরও বেশি সময় আগে ড্রোনটি কার্যত “জলের মধ্যে অচল” অবস্থায় ছিল। একই সঙ্গে তিনি জানান, ওই এলাকায় মার্কিন সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অর্থাৎ, ইরান ঘটনাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও মার্কিন বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনও সক্রিয় বা সচল অত্যাধুনিক সাবমেরিন দখলের ঘটনা নয়।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ চিন সাগরে ‘ব্রহ্মোস বলয়’: চিনের বেড়াজালে কৌশলগত ফাঁদ পাতছে ভারত?
কতটা শক্তিশালী Dive-LD?
ডাইভ-এলডি একটি প্রায় ৫.৮ মিটার বা ১৯ ফুট লম্বা স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ভেহিকল। এর ওজন প্রায় ৩ টন। অ্যান্ডুরিলের তথ্য অনুযায়ী, এটি একবার মোতায়েন হওয়ার পর ১০ দিন পর্যন্ত ঘাঁটিতে না ফিরেই কাজ করতে পারে। আবার প্রায় ৬,০০০ মিটার বা ১৯,৭০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত ডুব দিতে সক্ষম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর মডুলার ডিজাইন। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী এতে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ও পেলোড যুক্ত করা যায়। এর সম্ভাব্য কাজের মধ্যে রয়েছে:
- গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
- নজরদারি ও রিকনাইস্যান্স
- সমুদ্রতলের মাইন শনাক্ত ও মোকাবিলা
- সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি
- সমুদ্রের নিচে থাকা কেবল ও পাইপলাইনের পরিদর্শন
- পানির নিচে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ
‘Attritable’ মানে কী?
অ্যান্ডুরিল জানিয়েছে, ডাইভ-এলডি একটি ‘অ্যাট্রিটেবল অটোনোমাস সিস্টেম’। সহজভাবে বললে, এমনভাবে এটি তৈরি করা হয়েছে যাতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের জীবন বিপন্ন না করে মেশিনকে পাঠানো যায়।
এই ধরনের ব্যবস্থায় ড্রোন হারিয়ে গেলে সেটিকে সবসময় বিপর্যয় হিসেবে ধরা হয় না। বরং মানবসদস্যের জীবন বাঁচানো এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিপজ্জনক এলাকায় নজরদারি চালানোই মূল লক্ষ্য।
অ্যান্ডুরিলের দাবি, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এলাকায় ডাইভ-এলডি ইতিমধ্যেই হাজার হাজার ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সক্ষমতা দিয়েছে। ২০২৪ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই সময় প্রতিটি ডাইভ-এলডি-র দাম প্রায় ২৫ লাখ ডলার ছিল।
ইরানের হাতে গেলে কী লাভ হতে পারে?
ঘটনাটি সত্যিই ডাইভ-এলডি আটক করার ঘটনা হলে, ইরানের জন্য এর প্রযুক্তিগত গুরুত্ব থাকতে পারে। কারণ স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার সিস্টেমের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করছে।
ইরানও নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় এবং অস্ত্রসজ্জিত আন্ডারওয়াটার সিস্টেম তৈরি করেছে। ফলে মার্কিন প্রযুক্তির একটি নমুনা হাতে পাওয়া গেলে সেটির নকশা, সেন্সর ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এমনকি এই প্রযুক্তি রাশিয়া বা চিনের মতো ইরানের সহযোগী দেশগুলির সঙ্গে ভাগ করা হতে পারে বলেও জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে এমন কোনও তথ্য এখনও নিশ্চিত নয়।
মার্কিন নৌবাহিনী কেন এই প্রযুক্তিতে জোর দিচ্ছে?
বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী মানবহীন আন্ডারওয়াটার ও সারফেস সিস্টেমের উপর ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। কারণ বিশাল সমুদ্র এলাকায় নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতিপক্ষের জাহাজ শনাক্ত করতে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলেই এই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায়।
ডাইভ-এলডি-র পাশাপাশি অ্যান্ডুরিল মার্কিন নৌবাহিনীকে আরও বড় ডাইভ-এক্সএল (Dive-XL) সিস্টেমও সরবরাহ করছে।
তাই ইরানের হাতে একটি ডাইভ-এলডি চলে যাওয়ার ঘটনা সামরিক প্রযুক্তির দিক থেকে নজরকাড়া হলেও, এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সাবমেরিন প্রযুক্তির সম্পূর্ণ দখল হিসেবে দেখা এখনই ঠিক হবে না। বিশেষ করে মার্কিন পক্ষের দাবি অনুযায়ী ডিভাইসটি আগেই বিকল হয়েছিল এবং এতে শ্রেণিবদ্ধ সরঞ্জাম ছিল না।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, ড্রোনটি কীভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল এবং সেটির ভিতরের সেন্সর, স্টোরেজ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপাদানের কতটা কার্যকর অবস্থায় ছিল। সেই তথ্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত ইরানের দাবির সামরিক গুরুত্ব নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন।
