নতুন আইফোন কেনার পরিকল্পনা থাকলে অপেক্ষা না করে এখনই কেনা ভালো হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অ্যাপলের আসন্ন আইফোন ১৮ (iPhone 18) সিরিজের দাম গত বছরের মডেলের তুলনায় অন্তত ১০০ ডলার বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের অনুমান। আর এর পিছনে অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বুমের কারণে মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধি।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশ্লেষকদের অনুমান অনুযায়ী, নতুন আইফোনগুলি আগামী সপ্তাহে উন্মোচিত হতে পারে। তবে অ্যাপলের প্রিমিয়াম প্রো এবং প্রো ম্যাক্স মডেলের দাম আরও বেশি বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় ১০০ ডলারের দাম প্রায় ৮,০০০ টাকার কাছাকাছি, আর ২০০ ডলারের বৃদ্ধি হলে তা প্রায় ১৭,০০০ টাকা হতে পারে। অবশ্য ভারতের চূড়ান্ত দাম কর, আমদানি ও অন্যান্য খরচের কারণে আলাদা হতে পারে।
Read More: দেশীয় প্রযুক্তিতে আরও এক ধাপ! তেজস বিমানের কাবেরি ইঞ্জিনের পরীক্ষা সফল
প্রো ও প্রো ম্যাক্সে ১৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে দাম
আইডিসির সিনিয়র রিসার্চ ডিরেক্টর নাবিলা পোপালের অনুমান, আইফোনের উচ্চমূল্যের মডেলগুলির দাম ২০২৫ সালের সংস্করণের তুলনায় প্রায় ২০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে কয়েকজন বিশ্লেষক প্রায় ১০০ ডলার দাম বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছেন। অর্থাৎ, নতুন আইফোন ১৮ কেনার ক্ষেত্রে শুধু নতুন ফিচার নয়, দামও বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এআই বুমে কেন বাড়ছে মেমোরি চিপের দাম?
এর মূল কারণ এআই। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এআই ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। এআই পরিষেবা চালাতে প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারে প্রচুর মেমোরি চিপ ব্যবহৃত হয়। ফলে মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। গত এক বছরে কিছু মেমোরি কম্পোনেন্টের দাম প্রায় চারগুণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাব শুধু স্মার্টফোনে সীমাবদ্ধ নেই। কম্পিউটার, গেমিং কনসোল এবং স্মার্ট-হোম ডিভাইসের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। মরগ্যান স্ট্যানলি এই পরিস্থিতিকে ‘চিপফ্লেশন’ বা চিপের কারণে পণ্যের মূল্যস্ফীতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। টেকইনসাইটসের কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স খরচ বিশ্লেষক ওয়েন ল্যামের মতে, কম্পোনেন্টের দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে আগামী কয়েক বছরেও স্মার্টফোনের দাম আরও বাড়তে পারে।
Read More: প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নতুন প্রাণ অন্নেষণ! ভরসা স্পেস এক্সের ফ্যালকন
নতুন আইফোন এলেও পুরনো মডেলের দাম কমবে না?
নতুন আইফোন বাজারে এলে আগের প্রজন্মের মডেলের দাম সাধারণত কমে যায়। কিন্তু এবার সেই চেনা ছবিও বদলে যেতে পারে। নাবিলা পোপাল এবং অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইফোন ১৮ বাজারে আসার পর পুরনো কিছু আইফোনের দাম একেবারেই কমানো নাও হতে পারে। বরং কয়েকটি পুরনো মডেলের দাম অপরিবর্তিত থাকতে পারে বা ১০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তেও পারে। এর ফলে নতুন এবং পুরনো আইফোনের মধ্যে দামের পার্থ্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অ্যাপল ইতিমধ্যেই অন্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছে
মেমোরি চিপের বাড়তি খরচ অ্যাপলের জন্য নতুন সমস্যা নয়। সংস্থাটি চলতি বছরেই একাধিক পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। জুন মাসে নির্বাচিত ম্যাক, আইপ্যাড এবং হোমপড স্পিকার-এর দাম সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। অ্যাপলের তৎকালীন সিইও টিম কুক জুলাইয়ে মেমোরি চিপের বাড়তি খরচকে ‘১০০ বছরের বন্যা’-র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এবার সেই খরচের চাপ আইফোনের ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বছর নতুন সস্তার আইফোন নাও আসতে পারে
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে অ্যাপলের আইফোন লাইনআপে। রিপোর্ট ও বিশ্লেষকদের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নতুন এন্ট্রি-লেভেল আইফোন নাও আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্রেতাদের সামনে থাকতে পারে প্রিমিয়াম আইফোন ১৮ সিরিজের মডেল, যার মধ্যে প্রো এবং প্রো ম্যাক্স সংস্করণও থাকবে। এর পাশাপাশি অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন আসতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে। সেটির দাম ২,০০০ ডলার বা তার বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এন্ট্রি-লেভেল নতুন আইফোনটি সম্ভবত আগামী বছরের শুরুতে আসতে পারে। তবে তখনও তার প্রারম্ভিক দাম আগের তুলনায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দাম বাড়লেও অ্যাপলের লাভ বাড়বে না?
খুচরো দাম ১০০ ডলার বাড়ালেই অ্যাপল পুরো বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে, এমনটা নাও হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চিপ এবং অন্যান্য কম্পোনেন্টের খরচ যে হারে বাড়ছে, তার তুলনায় ১০০ ডলার দাম বৃদ্ধি যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে অ্যাপলের মুনাফার হার বা মার্জিনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বেশি দাম ক্রেতাদের চাহিদাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ, মার্কিন মোবাইল পরিষেবা সংস্থা এটি অ্যান্ড টি, টি-মোবাইল এবং ভেরাইজন-এর কর্তারা নতুন আইফোনের বাড়তি দাম সামাল দিতে প্রচারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটি অ্যান্ড টি-র সিইও জন স্ট্যাঙ্কি সতর্ক করেছেন, ডিভাইসের দাম বাড়লে চাহিদা দুর্বল হতে পারে।
পুরনো ফোনই মেরামত করছেন বেশি মানুষ
দাম বৃদ্ধির প্রভাবের আরেকটি লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স মেরামতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলি জানিয়েছে, আরও বেশি ক্রেতা নতুন ফোন কেনার পরিবর্তে পুরনো স্মার্টফোন মেরামত করে ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অর্থাৎ, নতুন ডিভাইসের দাম ক্রমশ বাড়তে থাকলে ফোন বদলানোর সময়সীমাও দীর্ঘ হতে পারে।
মেমোরি চিপের দাম কি দ্রুত কমবে?
শিল্পক্ষেত্রের কয়েকজন কর্তার পূর্বাভাস, মেমোরি চিপের দাম বহু বছর ধরেই উচ্চ থাকতে পারে। কিছু পূর্বাভাসে এমনকি ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই খরচের চাপ থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তাই আইফোনের সম্ভাব্য দাম বৃদ্ধি শুধু এবারের একটি সাময়িক সমস্যা নাও হতে পারে। এআই ডেটা সেন্টারের জন্য মেমোরির বিপুল চাহিদা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং অন্যান্য ভোক্তা প্রযুক্তি পণ্যের দামও দীর্ঘমেয়াদে নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। তাই নতুন আইফোন কেনার পরিকল্পনা থাকলে প্রশ্নটা শুধু ‘আইফোন ১৮ কত নতুন ফিচার দেবে’ নয়, বরং ‘এখন কিনব, নাকি আরও দাম বাড়ার অপেক্ষা করব’ সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
