কাঠমাণ্ডু: নদী কতটা জমি গিলেছে বা বন্যায় কত কোটি টাকার সম্পত্তি ধূলিসাৎ হয়েছে, এই মুহূর্তে নেপালের শত শত পরিবারের কাছে সেই হিসেব একেবারেই অর্থহীন। গত সপ্তাহে আছড়ে পড়া সর্বগ্রাসী হড়পা বানের পর রসুয়া ও নুয়াকোটের মতো পাহাড়ি উপত্যকায় এখন একটাই আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, ‘আমাদের সন্তানরা কোথায়?’ ‘দ্য কাঠমাণ্ডু পোস্ট’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এই দুই জেলাতেই এখনও পর্যন্ত হদিস মিলছে না প্রায় ৬০০ শিশুর।
গত ২৬ অগস্ট হিমবাহ ফেটে নেমে আসা আকস্মিক হড়পা বানের পর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হয়েছে। প্রাথমিক ধ্বংসলীলা পেরিয়ে বিপর্যয় এখন ঢুকে পড়েছে এক নীরব, নিঃসীম যন্ত্রণার অধ্যায়ে, যা শুধুই অপেক্ষা, সন্ধান এবং আশঙ্কার দোলাচলে বেঁচে থাকা। বহু এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি স্তব্ধ। ফলে কোনও শিশু কোথাও বেঁচে রয়েছে কি না, কিংবা উদ্ধার হয়ে ত্রাণশিবিরে পৌঁছেছে কি না, সেই একটিমাত্র ফোনকল বা তালিকায় নিজের সন্তানের নামটি দেখার জন্য হাহাকার করছেন সন্তানহারা বাবা-মায়েরা।
ধূলিসাৎ ১২টি স্কুল, মুছে গিয়েছে নথিপত্র
সাধারণত এ ধরনের পাহাড়ি প্রত্যন্ত এলাকায় পড়ুয়াদের যাবতীয় তথ্য বা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সূত্র থাকে স্থানীয় স্কুলগুলি। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে নুয়াকোটে ৮টি এবং রসুয়ায় ৪টি স্কুল সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ভেসে গিয়েছে সমস্ত নথি।
এক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কথায়, ‘‘স্কুল চত্বরটা এখন একটা খাঁ-খাঁ করা নদীর চরে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে আমরা এক লহমায় প্রস্তর যুগে পিছিয়ে গিয়েছি।’’ নুয়াকোট শিক্ষা ইউনিটের প্রধান সূর্য বাহাদুর ক্ষত্রী জানান, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত তথ্য এক জায়গায় করা মারাত্মক কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁদের জেলা থেকেই অন্তত ৩০০ পড়ুয়ার কোনও হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
সন্তান খুঁজছে বাবাকে, বাবা খুঁজছেন সন্তানকে
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি কতটা মর্মান্তিক, তা ফুটে উঠেছে স্কুল পরিদর্শক নবরাজ সাপকোটার কথায়। তিনি জানান, ‘‘মাঠপর্যায়ের চিত্রটা শিউরে ওঠার মতো। কোথাও বেঁচে ফেরা বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন, আবার কোথাও কোনও প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিশু ধ্বংসস্তূপের মাঝে নিজের বাবা-মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।’’
আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) জানিয়েছে, রসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিঙে হড়পা বানের শিকার হয়েছে অন্তত ১৭ হাজার শিশু। এই শিশুদের কাছে অবিলম্বে জরুরি মানবিক ও স্বাস্থ্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালের দেওয়ালে ‘নিখোঁজদের ছবি’
রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৬ অগস্টের এই বিপর্যয়ে নেপালে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১,২০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ ৪,২০০-রও বেশি মানুষ। কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে তৈরি হয়েছে একটি ‘ওয়াল অব দ্য মিসিং’ বা নিখোঁজদের দেওয়াল। যেখানে উদ্ধার হওয়া বেওয়ারিশ মৃতদেহের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার আশায় নিখোঁজ প্রিয়জনদের ছবি সেঁটে অশ্রুসজল চোখে ভিড় করছেন শত শত মানুষ।
প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, পাহাড়ি দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং বিধ্বস্ত রাস্তাঘাটের কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন প্রথম কাজ হলো বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে নিখোঁজ শিশুদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করা এবং জীবিতদের দ্রুত তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
মাঝআকাশে আচমকা অসুস্থ পাইলট! মাসকটে জরুরি অবতরণ বেঙ্গালুরুগামী ইন্ডিগো বিমানের
বিপদ কাটেনি! আলগা হিমবাহ থেকে নেপালে ফের বিধ্বংসী বন্যার আশঙ্কা
