রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ‘যে কোনও সাহায্য’ প্রস্তুত ভারত, কিয়েভে জয়শঙ্করের বার্তা

কিয়েভ: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের (Russia Ukraine War) অবসান ঘটাতে ভারত “যে কোনওভাবে যে কোনও সাহায্য” করতে প্রস্তুত। বৃহস্পতিবার কিয়েভে ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিহার সঙ্গে বৈঠকের পর…

jaishankar-ukraine-visit-india-ready-help-end-russia-ukraine-war

কিয়েভ: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের (Russia Ukraine War) অবসান ঘটাতে ভারত “যে কোনওভাবে যে কোনও সাহায্য” করতে প্রস্তুত। বৃহস্পতিবার কিয়েভে ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিহার সঙ্গে বৈঠকের পর এমনই বার্তা দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পঞ্চম বছরে দাঁড়িয়ে ভারত ফের সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে জোর দিল। সিবিহার সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে জয়শঙ্কর বলেন, ভারত ধারাবাহিকভাবে মনে করে আসছে যে “এটি যুদ্ধের যুগ নয়” এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনও সমাধান বেরিয়ে আসবে না।

Advertisements

‘যুদ্ধের বদলে যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন’

জয়শঙ্কর জানান, মাত্র দু’দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিরগিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বলেছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বদলে এবার যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন। ভারতের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য, সংঘাত যত দিন চলবে, ততই মৃত্যু ও ধ্বংস বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। তবে ভারত কোনওভাবে সাহায্য করতে পারলে সেই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। রাশিয়া ও ইউক্রেনকে নিয়মিত আলোচনার টেবিলে বসে কূটনৈতিক উপায়ে সংঘাতের সমাধান করার আহ্বান জানিয়ে আসছে নয়াদিল্লি।

   

Read More: ‘মা’-কে ‘আম্মা’, আকাশকে…..,পরিকল্পিত ভাষা বিকৃতি করেছিল তৃণমূল! তীব্র কটাক্ষ শুভেন্দুর

জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক জয়শঙ্করের

ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি-র সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন জয়শঙ্কর। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও গভীর করার পাশাপাশি চলমান যুদ্ধের অবসানের সম্ভাব্য পথ নিয়েও আলোচনা হয়। জয়শঙ্কর জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদির শুভেচ্ছা ও শুভকামনাও তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন। জেলেনস্কি পরে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ভারতকে যুদ্ধের অবসানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার জন্য ধন্যবাদ জানান। তাঁর বক্তব্য, এটি অবশ্যই যুদ্ধের সময় নয়। শান্তি প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিশ্বের অন্যান্য বড় শক্তিও যুদ্ধের অবসান এবং একটি নির্ভরযোগ্য শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেবে।

Advertisements

কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়ে উদ্বেগ

জয়শঙ্কর ও জেলেনস্কির আলোচনায় কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতি এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, খাদ্য সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলের মানুষ খাদ্য সরবরাহের জন্য এই সামুদ্রিক পথের উপর নির্ভরশীল, সেখানে এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে। ইউক্রেনের বন্দর, খাদ্য করিডর এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আটকে দেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

Read More: নেপালে নিখোঁজ মুকুল-পুত্রবধূ! স্ত্রীর খোঁজ চেয়ে সমাজমাধ্যমের দ্বারস্থ শুভ্রাংশু

ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর একাধিক হামলা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। জয়শঙ্কর জানান, বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ভারতীয় নাবিকরা কাজ করেন। ফলে তাঁরা এই ধরনের হামলার দুর্ভাগ্যজনক শিকার হয়েছেন। এই হামলার প্রভাব শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বের বহু গ্লোবাল সাউথ দেশের উপরও তার প্রভাব পড়ছে। এর ফলে জ্বালানি, সার এবং খাদ্য সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে জানান জয়শঙ্কর।

কিয়েভে ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুতেও শোক

ক্রমবর্ধমান রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের মধ্যেই কিয়েভ সফরে যান জয়শঙ্কর। তিনি জানান, মাত্র দু’দিন আগেই কিয়েভে একটি হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে মৃতের পরিবার এবং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সমস্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি। জয়শঙ্কর বলেন, তাঁর এই সফরের একটি দ্বিপাক্ষিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে ২০২২ সাল থেকে চলতে থাকা যুদ্ধের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও সফরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

ইউক্রেনকে ১৯ দফা মানবিক সহায়তা

ভারত ইতিমধ্যেই ইউক্রেনকে মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। জয়শঙ্কর জানান, ভারত এখনও পর্যন্ত ইউক্রেনে ১৯টি দফায় মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

দুই দেশের বাণিজ্যেও নতুন সুযোগ

যুদ্ধের প্রভাব ভারত-ইউক্রেন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যেও পড়েছে। দুই দেশের মধ্যে ওষুধ, খাদ্য ও কৃষি পণ্য, সার, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক এবং ভোগ্যপণ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাণিজ্য রয়েছে। জয়শঙ্করের মতে, গত চার বছরে যুদ্ধ এবং লজিস্টিক সমস্যার কারণে বাণিজ্যে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে এর মধ্যেও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক যথেষ্ট স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে এবং নতুন কিছু সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যতে এই পরিমাণ আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

AI, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা

দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, ইউক্রেনের নিজস্ব শক্তিশালী দক্ষতা রয়েছে। অন্যদিকে ভারতও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং স্টার্টআপ ক্ষেত্রে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এমনকি প্রশাসনের ক্ষেত্রেও ভারত ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন সহযোগিতার দরজা খুলে দিতে পারে।

শান্তি প্রক্রিয়ায় ভারতের আরও সক্রিয় ভূমিকা?

ইউক্রেনের বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, দুই মন্ত্রী শান্তি প্রক্রিয়া, কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা এবং রাশিয়ার সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি নিয়েও আলোচনা করেছেন। সিবিহা জানিয়েছেন, ইউক্রেন কূটনীতির পথে এগোতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী মোদির সাম্প্রতিক বার্তার সঙ্গে ইউক্রেনও একমত যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন। ভারতের আরও সক্রিয় আন্তর্জাতিক ভূমিকার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। জয়শঙ্কর ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রীকে পরবর্তী আন্তঃসরকারি কমিশন বৈঠকের জন্য সুবিধামতো ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

গান্ধীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সফর শেষ

কিয়েভ সফরের শেষে জাতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেনে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান জয়শঙ্কর। সেখানে তিনি বলেন, গান্ধীর জীবন ও তাঁর বার্তা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে যুদ্ধের অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পঞ্চম বছরে কিয়েভ সফরে ভারতের বার্তা তাই স্পষ্ট: যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারত প্রয়োজন হলে যে কোনও ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানিয়ে দিল নয়াদিল্লি।

Advertisements