শিকাগো: ভারতকে শুধু বড় বাজার হিসেবে নয়, বরং বিশ্বের জন্য উৎপাদন ও উদ্ভাবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ (Nirmala Sitharaman)। শুক্রবার শিকাগোয় এক উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক নেতাদের ভারতে উৎপাদন কেন্দ্র, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ভারতের কনসুলেট জেনারেল এবং ইউএস-ইন্ডিয়া স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ ফোরামের যৌথ উদ্যোগে এই বিজনেস রাউন্ডটেবিলের আয়োজন করা হয়। বৈঠকের মূল বিষয় ছিল ‘ভারতে উৎপাদন, ভারতের জন্য এবং বিশ্বের জন্য’। সীতারমণ বলেন, গত এক দশকে সংস্কার, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং অর্থনীতির বিস্তৃত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ভারতের বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতিগত লক্ষ্য এখন ব্যবসাকে ভারতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণে আরও বেশি সুযোগ দেওয়া।
শুধু ভারতের বাজার নয়, বিশ্বের জন্য উৎপাদন
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে ভারতের বাজারকে শুধুমাত্র পণ্য বিক্রির জায়গা হিসেবে না দেখে উৎপাদন এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবসা পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি চাইলে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে পণ্য ও প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে এবং সেগুলি বিশ্বের অন্যান্য বাজারেও রফতানি করতে পারে। উৎপাদন কেন্দ্রের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কেন্দ্র, ভোক্তা বাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভারতের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সংস্থাগুলি তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা উৎপাদন পরিকাঠামো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে বলে সীতারমণ দাবি করেন।
এআই, সেমিকন্ডাক্টর থেকে ইলেকট্রনিক্সে সুযোগ
বৈঠকে উৎপাদন শিল্পের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ডিজিটাল প্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা, পরিকাঠামো, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রতিরক্ষা এবং উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। সীতারমণ বলেন, আধার, ইউপিআই, ডিজিলকার, ওএনডিসি এবং ইন্ডিয়া স্ট্যাকের মতো ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইতিমধ্যেই কোটি কোটি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী পরিকাঠামো তৈরি করেছে।
এবার সেই ভিত্তির উপর আরও উচ্চমূল্যের ব্যবসা তৈরির সুযোগ রয়েছে। এআই, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো ক্ষেত্রে ভারত আরও বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে তিনি জানান। ভারতে থাকা গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টারগুলিও ধীরে ধীরে শুধুমাত্র পরিষেবা কেন্দ্র না থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির গবেষণা এবং উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
গিফট সিটি নিয়েও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বার্তা
আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রেও ভারতের সম্ভাবনা তুলে ধরেন সীতারমণ। তাঁর মতে, গুজরাতের গিফট সিটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত গিফট সিটিতে ১,২৫০টি সংস্থা নিবন্ধিত হয়েছে বলে জানান তিনি। ব্যাঙ্কিং, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট, রিইনস্যুরেন্স, বিমান ও জাহাজ লিজিং এবং পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির জন্য সুযোগ রয়েছে। বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে গিফট সিটিকে ভারতের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।
উৎপাদনে শুধু অ্যাসেম্বলি নয়, জোর কম্পোনেন্ট তৈরিতে
ভারতের উৎপাদন শিল্পে এখন শুধু পণ্য জোড়া লাগানোর পরিবর্তে আরও গভীর উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান সীতারমণ। উৎপাদন-সংযুক্ত উৎসাহ বা পিএলআই-এর মতো নীতির মাধ্যমে কম্পোনেন্ট উৎপাদন, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর সময়ে এই পরিবর্তন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে বলে তিনি মনে করেন।
পরিকাঠামোতেও বড় বিনিয়োগের সুযোগ
ভারতের দ্রুত পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর, রেলপথের আধুনিকীকরণ, রেল বৈদ্যুতিকীকরণ এবং দ্রুতগতির রেল প্রকল্পের মতো ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রযুক্তি, নির্মাণসামগ্রী, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সীতারমণ জানান, ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এই পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগে অংশ নিতে পারেন।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কৃষিতেও সম্ভাবনা
ভারতের বিশাল কৃষিভিত্তি, মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং বদলে যাওয়া ভোগের ধরন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে নতুন সুযোগ তৈরি করছে বলেও জানান তিনি। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, অটোমেশন, প্যাকেজিং, লজিস্টিক্স এবং কোল্ড চেনের মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে শুধু ভারতের বাজার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও ব্যবসা তৈরি করা সম্ভব বলে তাঁর বক্তব্য।
ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগের ডাক
আত্মনির্ভর ভারত এবং আইডেক্স-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ভারত ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বলে জানান সীতারমণ। এই ক্ষেত্রেও বিদেশি সংস্থাগুলির সঙ্গে যৌথভাবে প্রযুক্তি তৈরি এবং উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে আমেরিকা সফরে রয়েছেন নির্মলা সীতারমণ। তাঁর এই ছয় দিনের সফরে শিকাগোর পাশাপাশি নিউইয়র্ক সফর এবং উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত হতে চলা জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
সীতারমণের শিকাগো বৈঠকের মূল বার্তা স্পষ্ট, ভারত শুধু বিশ্বের অন্যতম বড় ভোক্তা বাজার নয়, আগামী দিনে বিশ্বের জন্য পণ্য, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন
