সোনার দামে ৯.৬% উত্থান, এখন বিনিয়োগ করবেন নাকি লাভ তুলবেন?

কলকাতা: গত এক মাসে সোনার দাম (Gold Price) প্রায় ৯.৬ শতাংশ বেড়েছে। দীর্ঘ সময় প্রায় স্থির থাকার পর এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি…

কলকাতা: গত এক মাসে সোনার দাম (Gold Price) প্রায় ৯.৬ শতাংশ বেড়েছে। দীর্ঘ সময় প্রায় স্থির থাকার পর এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। যদিও গত এক বছরে সোনার রিটার্ন এখনও প্রায় -১.৮ শতাংশ। ফলে সাম্প্রতিক উত্থানের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এখন সোনায় টাকা ঢালা উচিত, নাকি ইতিমধ্যে হওয়া লাভ তুলে নেওয়া ভালো?

Advertisements

বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার দামে আরও ঊর্ধ্বগতি হতে পারে। তবে এই পর্যায়ে হঠাৎ করে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার ঝুঁকিও রয়েছে। বরং যাঁদের পোর্টফোলিওতে সোনার অংশ ইতিমধ্যেই বেড়ে গিয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে লাভ তুলে নিয়ে পোর্টফোলিও রিব্যালান্স করা বেশি যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

   

কেন হঠাৎ বাড়ছে সোনার দাম?

সোনার সাম্প্রতিক উত্থানের পিছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত প্রত্যাশা। বাজারে সুদের হার কমার সম্ভাবনা বাড়ায় মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের প্রকৃত সুদের হার বা রিয়েল ইয়িল্ড কমার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। মোহিত বাগদি, মিরা মানির হেড অফ রিসার্চের মতে, কম রিয়েল ইয়িল্ড সোনার মতো কোনও সুদ না দেওয়া সম্পদের চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

আমেরিকার ঋণ নিয়েও উদ্বেগ

সোনার দামে জোর আসার আরেকটি কারণ আমেরিকার আর্থিক পরিস্থিতি। আমেরিকার জাতীয় ঋণ প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় ডলারের ভবিষ্যৎ শক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভেনচুরার কমোডিটিজের হেড এনএস রামাস্বামীর মতে, এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন, যার সরবরাহ কাগুজে মুদ্রার মতো সহজে বাড়ানো যায় না। সোনা সেই তালিকায় অন্যতম। এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সোনা কেনা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদাও দামকে সমর্থন করছে।

Advertisements

সেপ্টেম্বরেই কি আরও বাড়তে পারে দাম?

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সোনার এই দৌড় এখনও শেষ হয়নি। বিশেষ করে ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ফেডারেল রিজার্ভের বৈঠক থেকে সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত এলে সোনার দামে আরও গতি আসতে পারে। কম রিয়েল ইয়িল্ড এবং দুর্বল ডলার আগামী ছয় মাসে সোনার জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। এছাড়া আমেরিকার আর্থিক ঘাটতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির রিজার্ভে সোনার অংশ বাড়ানো এবং নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯

আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ

আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন

তবে এবার রিটার্নের গতি কমতে পারে

সোনার দামে আরও উত্থানের সম্ভাবনা থাকলেও গত এক মাসের মতো দ্রুত রিটার্ন ভবিষ্যতে নাও মিলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার এখন বুল রান-এর মধ্যে থাকলেও সোনা অত্যন্ত সংবেদনশীল। সুদের হার, ডলার, ভূ-রাজনীতি কিংবা মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে সামান্য পরিবর্তনেও দামে বড় ওঠানামা হতে পারে। অর্থাৎ সামনে স্বল্পমেয়াদি সংশোধন বা করেকশন হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ফেডের সিদ্ধান্ত

সোনার দামের জন্য সবচেয়ে বড় স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি হতে পারে আমেরিকার সুদের হার সংক্রান্ত অবস্থানের পরিবর্তন। ফেড যদি প্রত্যাশার তুলনায় কড়া অবস্থান নেয়, তাহলে সোনার উপর চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ সুদের হার ও রিয়েল ইয়িল্ড বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারি বন্ডের মতো সুদ-দেওয়া সম্পদ তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শক্তিশালী ডলারও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা কমাতে পারে।

লাভ তুলে নেওয়া কি উচিত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সোনার দাম বেড়েছে বলে সব সোনা বিক্রি করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পোর্টফোলিওতে সোনার কতটা অংশ রয়েছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে মোট পোর্টফোলিওর ১০-১৫ শতাংশের বেশি সোনায় রাখা উচিত নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের। ধরা যাক, কোনও বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওর ১০ শতাংশ সোনায় ছিল। সাম্প্রতিক দামের বৃদ্ধির কারণে সেটি যদি ১৬-১৮ শতাংশ হয়ে যায়, তাহলে নতুন করে সোনা কেনার পরিবর্তে কিছুটা লাভ তুলে অন্য সম্পদে বিনিয়োগ করে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।

নতুন বিনিয়োগকারীরা কী করবেন?

যাঁরা এখনও সোনায় বিনিয়োগ করেননি, তাঁদের এই দামে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা ঢোকানো থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কারণ বড় ধরনের র‍্যালির পর দাম গড় অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। ফলে একবারে পুরো টাকা বিনিয়োগ করলে স্বল্পমেয়াদি পতনে ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এর পরিবর্তে নিয়মিত অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করলে গড় ক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অর্থাৎ সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপি পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। বড় অঙ্কের এককালীন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দাম কিছুটা সংশোধনের জন্য অপেক্ষা করা তুলনামূলকভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে।

সোনাকে কী হিসেবে দেখবেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনাকে মূলত পোর্টফোলিও হেজ এবং সম্পদ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত, সর্বোচ্চ রিটার্ন পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে নয়।  মূল্যস্ফীতি, বাজারে অস্থিরতা কিংবা ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় সোনা পোর্টফোলিওকে কিছুটা ভারসাম্য দিতে পারে। তাই অন্তত পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সোনায় বিনিয়োগ করাই ভালো।

গোল্ড ইটিএফ কিনলে কী দেখবেন?

সোনায় বিনিয়োগের অন্যতম জনপ্রিয় উপায় হল গোল্ড ইটিএফ। তবে শুধু গত রিটার্ন দেখে কোনও গোল্ড ইটিএফ বেছে নেওয়া উচিত নয়। কেনার আগে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই দেখা দরকার:

  • ট্র্যাকিং এরর: ইটিএফটি সোনার বাজারদরকে কতটা ভালোভাবে অনুসরণ করছে।
  • এক্সপেন্স রেশিও: ইটিএফ ধরে রাখার খরচ কত।
  • লিকুইডিটি: প্রয়োজনের সময় কত সহজে কেনাবেচা করা যায়।
  • এউএম বা ফান্ডের আকার: তুলনামূলক বড় ফান্ডে সাধারণত লেনদেনের সুবিধা বেশি হতে পারে।

এখন বিনিয়োগকারীদের কী করা উচিত?

সামগ্রিকভাবে বিশেষজ্ঞদের বার্তা হল, সোনার র‍্যালি দেখে হঠাৎ করে পিছনে ছুটবেন না। যাঁদের সোনায় বরাদ্দ ইতিমধ্যেই ১৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি হয়ে গিয়েছে, তাঁরা আংশিক লাভ তুলে পোর্টফোলিও রিব্যালান্স করতে পারেন। নতুন বিনিয়োগকারীরা একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা না ঢেলে ধাপে ধাপে বিনিয়োগের কথা ভাবতে পারেন। আর যাঁদের সোনায় বরাদ্দ এখনও নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক উত্থান দেখেই পুরো বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সোনাকে পোর্টফোলিওর সুরক্ষা-কবচ হিসেবে ব্যবহার করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

Advertisements