মুম্বই: ভারতের গাড়ির বাজারে আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভক্সওয়াগন (Volkswagen)। সংস্থাটি ভারতে নতুন গাড়ি, ইঞ্জিন প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ নিয়ে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নতুন করে পর্যালোচনা করছে। ইতিমধ্যেই আগামী বছর ভারতে একটি স্থানীয়ভাবে তৈরি কমপ্যাক্ট এসইউভি আনার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এই মডেলটি সংস্থার বিক্রি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ-কেও ভক্সওয়াগন ভারতে নিজেদের আন্তর্জাতিক মডেলের কিছু বিশেষ সংস্করণ আনার সুযোগ হিসেবে দেখছে। ভক্সওয়াগন এজি-র ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য এবং ভক্সওয়াগন ব্র্যান্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টমাস শ্যাফার জানিয়েছেন, এই বাণিজ্য চুক্তি ভারতে নির্দিষ্ট কিছু নিশ বা সীমিত বাজারের মডেল আনার ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ভারত-ইইউ চুক্তিতে বাড়তে পারে মডেলের পরিসর
টমাস শ্যাফারের মতে, ইউরোপে ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা হওয়া ভক্সওয়াগনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাজারে থাকা নির্দিষ্ট কিছু নিশ মডেল ভারতের বাজারে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।স তবে কোন কোন গাড়ি ভারতে আসতে পারে, সে বিষয়ে তিনি এখনও কোনও নির্দিষ্ট নাম জানাননি। ভক্সওয়াগন পরিস্থিতি নিয়ে আগামী কয়েক মাস ধরে বাজার বিশ্লেষণ করবে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারতে ভক্সওয়াগনের গাড়ির পরিসর শুধু স্থানীয়ভাবে তৈরি মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের কিছু বিশেষ গাড়িও যুক্ত হতে পারে।
ভারতের দিকে আরও বেশি নজর ভক্সওয়াগনের
বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বদলে যাওয়া বাণিজ্যনীতি এবং বিভিন্ন দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের প্রবণতা বাড়ার মধ্যে ভক্সওয়াগন নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। টমাস শ্যাফারের মতে, আগের মতো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গাড়ি তৈরি করে বিশ্বের অন্য বাজারে রফতানি করার ব্যবসায়িক মডেল এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। চিন, আমেরিকা এবং ইউরোপের বাজারে বাণিজ্য পরিস্থিতির পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে আমদানি শুল্ক এবং বাণিজ্যনীতি পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই ভক্সওয়াগনকেও নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল বদলাতে হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে ভারত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু গাড়ির বাজার নয়, প্রকৌশল ও গবেষণাতেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ
ভক্সওয়াগন ভারতের বাজারকে শুধু গাড়ি বিক্রির জায়গা হিসেবে দেখছে না। প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে সংস্থাটি। টমাস শ্যাফার বলেছেন, ভারতের বাজার দ্রুত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জ্ঞানভিত্তিক কর্মশক্তিও ভক্সওয়াগনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আগামী দিনে ভারতে ভক্সওয়াগনের উপস্থিতি শুধু গাড়ি উৎপাদন এবং বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৌশল ও গবেষণার ক্ষেত্রেও আরও বিস্তৃত হতে পারে।
৪০টিরও বেশি দেশে ভারত থেকে গাড়ি রফতানি
ভারতকে উৎপাদন এবং রফতানি কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্ব দিচ্ছে ভক্সওয়াগন। বর্তমানে ভারত থেকে তৈরি গাড়ি ৪০টিরও বেশি দেশে রফতানি করা হয়। মেক্সিকো ভারতের তৈরি ভক্সওয়াগন গাড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বাজার। টমাস শ্যাফারের মতে, রফতানি ভক্সওয়াগনের ব্যবসায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ভবিষ্যতেও সংস্থা এই ক্ষেত্র আরও শক্তিশালী করতে চায়। আগামী বছর যে কমপ্যাক্ট এসইউভি ভারতে তৈরি হবে, তার ক্ষেত্রেও রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের পাশাপাশি বিদেশে গাড়ি বিক্রি করতে পারলে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে এবং স্থানীয়ভাবে গাড়ি তৈরির ব্যবসায়িক যুক্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
পেট্রোলের পাশাপাশি সিএনজি, ডিজেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ি
ভক্সওয়াগনের বর্তমান ভারতীয় গাড়ির পরিসরে টার্বো-পেট্রোল ইঞ্জিনের ব্যবহার রয়েছে। তবে ভারতে সিএনজি এবং ডিজেলের চাহিদা এখনও রয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারও দ্রুত বাড়ছে। টমাস শ্যাফারের মতে, দীর্ঘমেয়াদে গাড়ির বৈদ্যুতিকীকরণ বাড়বে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভক্সওয়াগন অন্য ধরনের ইঞ্জিন প্রযুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে। ফ্লেক্স-ফুয়েল, সিএনজি, ডিজেল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তি ভক্সওয়াগনের কাছে ইতিমধ্যেই রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে এই প্রযুক্তিগুলি ব্যবহারও করছে সংস্থা।
সঠিক সময়ে স্থানীয় উৎপাদন
ভক্সওয়াগনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হল, ভারতের বাজারে কোন প্রযুক্তি কখন নিয়ে আসা হবে। টমাস শ্যাফার জানিয়েছেন, ভারতের গাড়ির বাজারে গত কয়েক মাসেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। তাই সংস্থাটি এখনও নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পুরোপুরি চূড়ান্ত করেনি। তবে ভক্সওয়াগনের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগুলি ইতিমধ্যেই রয়েছে। বাজারের পরিস্থিতি উপযুক্ত হলে সেই প্রযুক্তি ভারতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হবে। এর মধ্যে ফ্লেক্স-ফুয়েল, সিএনজি, ডিজেল এবং বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি রয়েছে। ভক্সওয়াগন একই সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের গাড়ি এবং নতুন গাড়ির প্ল্যাটফর্ম নিয়েও কাজ করছে। তবে ভারতের জন্য কোন মডেল বা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হবে, সেই পরিকল্পনা এখনও বিবেচনাধীন।
ভারতে বড় চ্যালেঞ্জ গাড়ির উৎপাদন খরচ
ভারতে ভক্সওয়াগনের অন্যতম বড় সমস্যা হল উৎপাদন খরচ। গত কয়েক বছর ধরে সংস্থা এমনভাবে গাড়ি তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে ভক্সওয়াগনের গুণমান এবং ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে, আবার উৎপাদন খরচও কমানো যায়। টমাস শ্যাফারের মতে, ভক্সওয়াগনের খরচের কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক বেশি। এর অন্যতম কারণ হল সংস্থার ব্যবসার বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ এবং বিশেষ করে জার্মানিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত কম খরচে গাড়ির উন্নয়ন এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
কম খরচে গাড়ি তৈরিতে ভারতকে ব্যবহার করতে চায় ভক্সওয়াগন
ভক্সওয়াগন ইতিমধ্যেই উৎপাদন খরচ কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সংস্থার লক্ষ্য হল উচ্চ খরচের দেশগুলিতে উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক কম খরচের উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে আরও বেশি কাজে লাগানো। ভারত সেই পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে পারে। দেশের তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ এবং দক্ষ কর্মশক্তি ভক্সওয়াগনের নতুন গাড়ির উন্নয়ন এবং উৎপাদনে সুবিধা দিতে পারে। আগামী দিনে ভারতে ভক্সওয়াগনের নতুন মডেল, বিনিয়োগ এবং ইঞ্জিন প্রযুক্তি নিয়ে আরও সিদ্ধান্ত সামনে আসতে পারে।
ভারতের জন্য ভক্সওয়াগনের সামনে বড় পরিকল্পনা
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভক্সওয়াগন ভারতের বাজারে নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক মডেল আনার সুযোগ পেতে পারে। একদিকে স্থানীয়ভাবে তৈরি কমপ্যাক্ট এসইউভি দিয়ে বিক্রি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে নিশ মডেল আমদানির সম্ভাবনা, রফতানি বৃদ্ধি, নতুন ইঞ্জিন প্রযুক্তি এবং স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে ভারতকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চাইছে সংস্থা। ফলে আগামী কয়েক বছরে ভারতের বাজারে ভক্সওয়াগনের পণ্য ও ব্যবসায়িক কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কোন নিশ মডেল ভারতে আসবে এবং নতুন কোন ইঞ্জিন প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে তৈরি হবে, সে বিষয়ে সংস্থার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
Also Read | পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের
