নয়াদিল্লি: নীতি আয়োগের নতুন প্রধান নির্বাহী আধিকারিক বা সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অনুরাগ জৈন (Anurag Jain)। ১৯৮৯ ব্যাচের মধ্যপ্রদেশ ক্যাডারের ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা বা আইএএস আধিকারিক অনুরাগ জৈন সোমবার নীতি আয়োগের সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার গত মাসে তাঁর নিয়োগে অনুমোদন দেয়। প্রাথমিকভাবে তাঁর মেয়াদ দুই বছর অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।
অনুরাগ জৈন এই পদে বিভিআর সুব্রহ্মণ্যমের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। সুব্রহ্মণ্যমের মেয়াদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার পর নীতি আয়োগের উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন দফতরের মহাপরিচালক নিধি ছিব্বর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সিইও-র কাজ সামলাচ্ছিলেন।
আইআইটি খড়গপুরের প্রাক্তনী অনুরাগ জৈন
প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অনুরাগ জৈনের শিক্ষাগত যোগ্যতাও উল্লেখযোগ্য। তিনি আইআইটি খড়গপুর থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে বিটেক বা প্রযুক্তিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে আমেরিকার ম্যাক্সওয়েল স্কুল থেকে জন প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রশাসনিক জীবনের শুরুতেই মধ্যপ্রদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯০ সালে সাগরে সহকারী কালেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে মাণ্ডলা, মন্দসৌর এবং ভোপালের কালেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন।
২০০৫ সালে তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সচিব হিসেবে কাজ করেন অনুরাগ জৈন। পরে তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের সচিবের দায়িত্বও পালন করেন।
মধ্যপ্রদেশ সরকারের সরকারি প্রোফাইল অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় রাজ্যে জন পরিষেবা প্রদান ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। সরকারি পরিষেবা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আইনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে
২০১১ সালে অনুরাগ জৈন কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে আসেন। অর্থ মন্ত্রকের আর্থিক পরিষেবা দফতরে যুগ্মসচিব হিসেবে কাজ করেন তিনি। তাঁর সরকারি প্রোফাইলে উল্লেখ রয়েছে, এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা-র পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত ছিলেন। এরপর ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দফতর বা পিএমও-তে যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
পরবর্তী সময়ে দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভাইস চেয়ারম্যান পদেও ছিলেন তিনি। এরপর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রসার দফতর বা ডিপিআইআইটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন।
এরপর সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অনুরাগ জৈন। পরিকাঠামো, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং সড়ক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের নীতি বাস্তবায়নে সেই সময় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রদেশের মুখ্যসচিব থেকে নীতি আয়োগ
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর অনুরাগ জৈন আবার মধ্যপ্রদেশে ফিরে গিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিবের দায়িত্ব নেন। মুখ্যসচিব হিসেবে তাঁর মেয়াদে রাজ্যে বাণিজ্য ও শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩০টি ক্ষেত্রভিত্তিক বিনিয়োগ নীতি তৈরির কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর চাকরির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়েছিল।
দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং অর্থনীতি, শিল্প, পরিকাঠামো ও জনপরিষেবা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার কারণেই নীতি আয়োগের শীর্ষ পদে অনুরাগ জৈনের নিয়োগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নীতি আয়োগের সামনে বড় দায়িত্ব
দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নীতি প্রণয়ন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নীতি আয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নতুন সিইও হিসেবে অনুরাগ জৈনের সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকবে। বিশেষ করে শিল্প ও বিনিয়োগ, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং দেশের উন্নয়নমূলক নীতির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে তাঁকে।
মধ্যপ্রদেশের প্রশাসন থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতর এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে নীতি আয়োগের শীর্ষ পদে এলেন অনুরাগ জৈন। ফলে আগামী দুই বছরে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
