Cockroach Janata Party: ভারতের নতুন সিভিল স্ফিয়ারের রাজনৈতিক উত্থান কী বলছে?

নয়াদিল্লি: দিল্লির রাস্তায় তরুণদের একটি নজিরবিহীন সামাজিক আন্দোলন দেখা গেল।  বিভিন্ন শ্রেণি, জাত, অঞ্চল, জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের তরুণরা নিজেদের “ককরোচ জনতা পার্টি” (Cockroach Janata Party)…

cockroach-janata-party-india-civil-sphere-political-movement

নয়াদিল্লি: দিল্লির রাস্তায় তরুণদের একটি নজিরবিহীন সামাজিক আন্দোলন দেখা গেল।  বিভিন্ন শ্রেণি, জাত, অঞ্চল, জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের তরুণরা নিজেদের “ককরোচ জনতা পার্টি” (Cockroach Janata Party) বা সিপিজে নামে পরিচয় দিয়ে পথে নামেন।  তাঁদের প্রতিবাদ শুধু পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বা বেকারত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাঁরা ভারতের গণতন্ত্রের আরও গভীর একটি বিষয়, অর্থাৎ দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা রক্ষার জন্য লড়ছেন।

Advertisements

গত কয়েক দশকে ভারতের জাতীয় সংহতির ধারণাকে ঘিরে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে টানাপোড়েন দেখা গেছে। একদিকে রয়েছে হিন্দুত্ব, যা হিন্দুধর্মকে একটি নাগরিক ধর্ম বা সিভিল রিলিজিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। অন্যদিকে রয়েছে সিভিল স্ফিয়ার, অর্থাৎ এমন একটি নাগরিক পরিসর যেখানে সার্বজনীন সংহতি, ব্যক্তির অধিকার এবং সাংবিধানিক নৈতিকতা গুরুত্ব পায়। ককরোচ জনতা পার্টির উত্থানকে এই দ্বন্দ্বের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

   

সিভিল স্ফিয়ার কী?

সিভিল স্ফিয়ার বলতে এমন একটি জনপরিসরকে বোঝায়, যেখানে মানুষ নাগরিক হিসেবে একত্রিত হয়ে নিজেদের অভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়। সিভিল রিলিজিয়ন যেখানে ঈশ্বর, ধর্মীয় বিশ্বাস বা পবিত্র ঐতিহ্য থেকে কর্তৃত্ব গ্রহণ করে, সিভিল স্ফিয়ার সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তির ওপর নির্ভর করে।

এই নাগরিক পরিসরের মধ্যে দুটি আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত ধারণা একসঙ্গে কাজ করে। একদিকে রয়েছে সমষ্টিগত সংহতি, অর্থাৎ একটি সম্প্রদায় হিসেবে মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুভূতি। অন্যদিকে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, অর্থাৎ নিজের মতো করে চিন্তা ও কাজ করার অধিকার।

Advertisements

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই মূল্যবোধগুলি একজন মানুষের জন্মপরিচয়ের ওপর নির্ভর করার কথা নয়। ধর্ম, জাত, বর্ণ বা পারিবারিক পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিকত্বের ভিত্তিতেই এই সংহতি তৈরি হওয়ার কথা। এই বিতর্কিত নাগরিক পরিসরেই ককরোচ জনতা পার্টির প্রবেশ।

অপমানজনক শব্দকে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করা

আন্দোলনের নামটিই সিপিজের রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। অভিযোগ, এক বর্তমান প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের সঙ্গে তুলনা করতে “ককরোচ” এবং “প্যারাসাইট” শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।

আন্দোলনকারীরা সেই অপমানজনক শব্দ থেকে পিছিয়ে না গিয়ে সেটিকেই নিজেদের পরিচয়ের অংশ করে নিয়েছেন। অর্থাৎ, যে শব্দ দিয়ে তাঁদের ছোট করা হয়েছিল, সেটিকেই তাঁরা প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছেন।

এটি ভারতের জনজীবনে দীর্ঘদিন ধরে থাকা বিভিন্ন দ্বৈত বিভাজনের প্রচলিত কাঠামোকেও উল্টে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিজেদের ইতিবাচক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা এবং প্রতিপক্ষকে নেতিবাচক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল।

প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

ককরোচ জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে পরীক্ষাব্যবস্থা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং কখনও কখনও প্রতিবাদ দমনে সহিংসতার অভিযোগকে সামনে এনেছে। আন্দোলনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত “অ্যান্টি-ন্যাশনাল” শক্তি প্রতিবাদকারী তরুণরা নন, বরং এমন প্রতিষ্ঠান, যারা নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও আন্দোলনের বিষয়টি শুধুমাত্র মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা বা পরীক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আটকে থাকেনি। এর পরিবর্তে আন্দোলনটি রাষ্ট্র, নাগরিকত্ব এবং গণতন্ত্রের বৃহত্তর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বেলাহ যে সিভিল রিলিজিয়ন ধারণার কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে এই বিতর্কের একটি যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, সংগঠিত ধর্মের পাশাপাশি এমন কিছু বিশ্বাস, প্রতীক ও আচারও থাকতে পারে, যা মানুষের ব্যক্তিগত প্রেরণাকে জাতীয় লক্ষ্যগুলির সঙ্গে যুক্ত করে।

হিন্দুত্ব বনাম সিভিল স্ফিয়ার

এই বিশ্লেষণে হিন্দুত্বকে একটি সিভিল রিলিজিয়ন হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধারণায় ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে নির্বাচিত প্রতীক ও ধারণাকে ব্যবহার করে বৃহত্তর জাতীয় সংহতি তৈরির চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই ধরনের সংহতির মধ্যে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি বর্জনের প্রবণতাও থাকতে পারে। হিন্দু ঐক্যের ধারণা তৈরি করার সময় মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ধর্মনিরপেক্ষদের মতো গোষ্ঠীকে বাইরের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।

এর বিপরীতে ককরোচ জনতা পার্টিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সিভিল স্ফিয়ার-ভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এখানে ধর্মীয় প্রতীক বা ঈশ্বরের পরিবর্তে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তির মর্যাদা এবং সার্বজনীন সংহতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানী জেফরি আলেকজান্ডার, যিনি রবার্ট বেলাহর ছাত্র ছিলেন, সিভিল স্ফিয়ারের এই ধারণাকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাবনায় ধর্ম, পরিবার, রাজনীতি এবং বাজারের মতো পরিচয় ও প্রতিষ্ঠান সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে। তার বিপরীতে নাগরিক সংহতি বৃহত্তর সামাজিক ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

প্রতিবাদ দমন নিয়ে প্রশ্ন

বিজেপির অন্যতম শক্তি হিসেবে তার সামাজিক আন্দোলনের শিকড়কে দেখা হয়, যার সঙ্গে আরএসএসের ভূমিকা যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং ব্যাপক গ্রেফতারের অভিযোগ উঠলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে: হিন্দুত্বের সিভিল রিলিজিয়নের সর্বজনীনতার দাবি যখন সরাসরি পরীক্ষার মুখে পড়ে, তখন কি সংলাপের বদলে দমনই বেছে নেওয়া হয়?

এটি শুধু একটি আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন নয়। বরং রাষ্ট্র, প্রতিবাদ এবং নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

রাজনীতির বাইরে থাকার ঘোষণা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ককরোচ জনতা পার্টি নিজেদের অরাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার কথা জানিয়েছে। এই অবস্থান ভারতের রাজনৈতিক গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

আন্দোলনের এই অবস্থান থেকে এমন একটি ধারণা সামনে আসে যে, তরুণদের একটি অংশ এমন জাতীয় সংহতির ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, যা একদিকে ঐক্যের কথা বলে, কিন্তু অন্যদিকে বিভাজন তৈরি করে। একইভাবে তারা এমন ঐতিহ্যের ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে, যা সাংবিধানিক ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা সংকুচিত করতে পারে।

শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটও এই নতুন ধরনের সংহতির সন্ধানের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং যুক্তির মতো অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে সংহতি তৈরির ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গণতন্ত্রের জন্য এর অর্থ কী?

ককরোচ জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা যদি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সিভিল রিলিজিয়ন এবং সিভিল স্ফিয়ার-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব বোঝার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যক্তির সমান অধিকার, নতুন ধরনের অ-জন্মগত নাগরিক সংহতি এবং সম্মিলিত বিবেকের মতো ধারণা ধীরে ধীরে ধর্মীয় ও পারিবারিক পরিচয়ভিত্তিক সংহতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভারতের নাগরিক পরিসরকে কতটা বদলাতে পারবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: গণতন্ত্র কি উপর থেকে দেওয়া কোনো অধিকার, নাকি নিচ থেকে মানুষের ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়?

ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা, রাজনৈতিক দল বা একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে এই আন্দোলন গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব, ব্যক্তির মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

Advertisements