রাঁচি: নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের অভিযোগে আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (JPSC) প্রাক্তন চেয়ারম্যান এল খিয়াংতে-কে সোমবার গ্রেফতার করল ঝাড়খণ্ড সিআইডি। এদিনই হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী বিধানসভা অভিযানে সামিল হন। মিছিলকারীরা একাধিক ব্যারিকেড ভেঙে বিধানসভা চত্বরে পৌঁছনোর চেষ্টা করলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং পরে লাঠিচার্জ করে।
নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলন এদিন ১৭তম দিনে পড়েছে। একই দিনে রাজ্য বিধানসভার অধিবেশন চলছিল এবং মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের ৫১তম জন্মদিনও ছিল।
একের পর এক ব্যারিকেড ভাঙলেন বিক্ষোভকারীরা
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ পুরনো বিধানসভা ভবনের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়। হাতে জাতীয় পতাকা এবং বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা বিধানসভার দিকে এগিয়ে যান।
মিছিলের প্রায় ৪ কিলোমিটার পথে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছিল প্রশাসন। র্যা পিড অ্যাকশন ফোর্স, ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন, জেলা পুলিশ এবং কুইক রেসপন্স টিমের ১,৫০০-র বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞামূলক নির্দেশও জারি করা হয়েছিল।
তবুও বিক্ষোভকারীরা একাধিক পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান। জগন্নাথপুর মন্দিরের কাছে পৌঁছলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এরপর আন্দোলনকারীরা বিধানসভার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হওয়ার দাবি
পুলিশের অভিযানে কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে তাঁরা দাবি করেছেন। এক বিক্ষোভকারী পীযূষ কুমার সোনি অভিযোগ করেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাঁদের উপর লাঠিচার্জ করেছে। তাঁর দাবি, কয়েকজন মহিলা পড়ুয়াও আহত হয়েছেন এবং তাঁদের মাথা, হাত ও মুখে আঘাত লেগেছে। হাজারিবাগ থেকে আন্দোলনে যোগ দেওয়া বিক্রম কুমারও মাথায় আঘাত পাওয়ার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পদক্ষেপ করে।
অনশনরত দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোও মিছিলে
জেএলকেএম নেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোও সোমবারের মিছিলে যোগ দেন। নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে তিনি গত নয় দিন ধরে অনশন করছেন। শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি অ্যাম্বুল্যান্সে করে মিছিলে পৌঁছন। তাঁর সঙ্গে ছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবু সোরেনের একটি প্রতিকৃতি। মিছিলের পথে কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসানো নিয়েও মাহাতো আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবিচারের অভিযোগ ঘিরে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।
সিবিআই তদন্তের দাবিতে স্লোগান
মিছিলকারীরা নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল এবং স্বাধীন তদন্তের দাবিতে স্লোগান দেন। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা বাতিল অথবা সিবিআই তদন্তের দাবি জানানো হয়। এছাড়াও সিআইডির তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশের দাবিতে বিভিন্ন বার্তা লেখা ছিল প্ল্যাকার্ডে। জলকামান ব্যবহারের সময় এক পর্যায়ে জাতীয় পতাকা হাতে কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে নাচতেও দেখা যায়। পরে বিধানসভার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়।
৫০০ স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন ছাত্র সংগঠনের
আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া জেপিএসসি-জেএসএসসি রিফর্মস মঞ্চ জানিয়েছে, মিছিলে অসামাজিক ব্যক্তিদের ঢুকে পড়া ঠেকাতে প্রায় ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছিল।
মঞ্চের নেতা রবীন্দ্র পাসওয়ান দাবি করেন, আন্দোলনকে অশান্ত করার জন্য অসামাজিক ব্যক্তিদের ঢোকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
কী কী দাবি ছাত্রদের?
আন্দোলনকারীরা জেপিএসসি এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (জেএসএসসি) পরীক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবিও রয়েছে।
তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে:
• ১৪তম ঝাড়খণ্ড পিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা বাতিল
• একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল
• কথিত অনিয়মের স্বাধীন তদন্ত
• সিবিআই তদন্ত অথবা ঝাড়খণ্ডের বাইরের অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে তদন্ত কমিটি
• জেপিএসসি ও জেএসএসসি পরীক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার
সরকার বলছে ৯৮% দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে
ছাত্রদের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা করেছে ঝাড়খণ্ড সরকার। সর্বশেষ আলোচনার পর সরকার দাবি করেছে, আন্দোলনকারীদের ৯৮% দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে ছাত্র প্রতিনিধিরা সেই দাবি মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা মোট ১৩টি পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছিলেন, কিন্তু সরকার মাত্র তিনটি পরীক্ষা বাতিল করতে সম্মত হয়েছে।
এই মতপার্থক্যের কারণে আলোচনার পরও অচলাবস্থা কাটেনি। বিশেষ করে জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা বাতিল এবং স্বাধীন তদন্তের দাবিই এখনও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয়।
আন্দোলনের মধ্যেই প্রাক্তন জেপিএসসি চেয়ারম্যান গ্রেফতার
এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রাক্তন জেপিএসসি চেয়ারম্যান এল খিয়াংতের গ্রেফতারি হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এই গ্রেফতারি আন্দোলনের সময়ে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছাত্ররা দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা হলেও এখনও সব দাবিতে ঐকমত্য হয়নি।
ফলে প্রাক্তন জেপিএসসি চেয়ারম্যানের গ্রেফতারি এবং একই দিনে বিধানসভা অভিযানে জলকামান ও লাঠিচার্জের ঘটনায় ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হল।
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের
