ওয়াশিংটন: রাশিয়ার কাছ থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ (Trump Tariff) তৈরির পথে এগোল আমেরিকা। মার্কিন সেনেট শুক্রবার একটি বিল পাস করেছে, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার জ্বালানি কেনা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের পণ্যের উপর ১০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পেতে পারেন। সম্ভাব্যভাবে এই তালিকায় ভারত, চিন এবং তুরস্ক রয়েছে।
তবে এই মুহূর্তে ভারতের উপর ১০০% শুল্ক কার্যকর হয়নি। ‘Lindsey O. Graham Sanctioning Russia and Iran Act of 2026’ নামে পরিচিত বিলটি এখন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে যাবে। ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে এই নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা এখনও আসেনি।
সেনেটে বিলটি ৮৬-১১ ভোটে পাস হয়েছে। বিলটি প্রয়াত রিপাবলিকান সেনেটর Lindsey O. Graham-এর নামে রাখা হয়েছে। তিনি রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং ১১ জুলাই মারা যান।
Also Read | তিরুবন্নামালাইয়ে অমিত শাহের সফরের আগেই চাঞ্চল্য! পুলিশের জালে ক্যামেরা চশমা পরিহিত দুই যুবক
প্রস্তাবিত আইনে শুধু রাশিয়ার তেল বা গ্যাসের বড় ক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়নি। রাশিয়ার উপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করা দেশ, রুশ ব্যাঙ্ক, সরকারি আধিকারিক, তথাকথিত oligarch এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত ‘shadow fleet’ ট্যাঙ্কারের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এই বিলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ভারতের ক্ষেত্রে। কারণ রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ার পর ভারতীয় শোধনাগারগুলি রুশ crude oil-এর বড় ক্রেতা হিসেবে থেকেছে।
Also Read | ভারত-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম ন্যাটো তৈরির আহ্বান পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর
তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ভারত রাশিয়া থেকে আমদানি বাবদ প্রায় ১৪.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্থ রুপিতে মিটিয়েছে। এই বৃদ্ধির সঙ্গে রুশ তেল কেনাকাটার সম্পর্ক রয়েছে।
ভারত এর আগেও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির চাপের মুখে পড়েছিল। ২০২৫ সালের অগস্টে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এর ফলে বহু ভারতীয় পণ্যের উপর মোট শুল্কের হার ৫০% পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার বিষয়ে সম্মত হওয়ার পর ওয়াশিংটন সেই অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক তুলে নেয়। একটি বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে আমেরিকা ভারতের উপর reciprocal tariff কমিয়ে ১৮% করেছিল।
নতুন বিল সেই পরিস্থিতিকে ফের জটিল করে তুলতে পারে। কারণ ভারত যদি রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখে, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে ভারতীয় পণ্যের উপর আরও বড় শুল্ক চাপানোর আইনি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত ১০০% শুল্ক মানেই যে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। বিলটিতে প্রেসিডেন্টের discretion-এর সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি national-interest waiver এবং কিছু exemption-এর ব্যবস্থাও রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া দেশগুলি ছাড় পাওয়ার যোগ্য হতে পারে।
ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রুশ তেল এখন দেশের energy security-র সঙ্গে যুক্ত। হঠাৎ করে রাশিয়ার বিকল্প উৎসে চলে গেলে অপরিশোধিত তেলের দাম, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দেশীয় জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, এই ধরনের শুল্কের প্রভাব শুধু যে রাশিয়া বা ভারতীয় রফতানিকারকদের উপর পড়বে, এমন নয়। আমেরিকায় আমদানি করা পণ্যের উপর শুল্ক প্রথমে মার্কিন importers-দের দিতে হয়। পরে সেই অতিরিক্ত খরচের একটি অংশ পণ্যের দামের মাধ্যমে মার্কিন ক্রেতাদের উপর পড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহকারী বা ব্যবসায়ীরাও খরচের অংশ বহন করতে পারেন।
এই কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন প্রস্তাবিত শুল্কনীতি আমেরিকার অভ্যন্তরেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, Federal Reserve-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আরোপ করা শুল্ক ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত core-goods-এর দাম ৩.১% বাড়িয়েছিল।
Yale Budget Lab-এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান শুল্কনীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার consumer price level প্রায় ০.৭% বাড়াতে পারে এবং গড় মার্কিন পরিবারের বছরে প্রায় ১,১০০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
ফলে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে ১০০% শুল্কের হুমকি দিলেও তার প্রভাব একমুখী নাও হতে পারে। ভারত ও চিনের মতো বড় ক্রেতারা বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকলে বিশ্ববাজারে তেলের দামেও প্রভাব পড়তে পারে। একইসঙ্গে ডলারের বাইরে বাণিজ্য বাড়া বা পাল্টা শুল্কের মতো পদক্ষেপও সামনে আসতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিলটি এখন মার্কিন হাউসে কীভাবে এগোয় এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন এর আওতায় কোন দেশ ও পণ্যের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপাতত ভারতের উপর ১০০% শুল্ক আরোপ করা হয়নি, তবে সেনেটে বিল পাস হওয়ায় রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে নয়াদিল্লির উপর মার্কিন চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
