আকাশে ‘উড়ন্ত চোখ’ বাড়াচ্ছে ভারত, দূর থেকেই ধরা পড়বে শত্রুর হামলা

কলকাতা: আধুনিক যুদ্ধে শুধু শক্তিশালী যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই হয় না, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল শত্রুকে যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করা। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়া,…

india-airborne-early-warning-awacs-netra-phalcon-air-defence-upgrade

কলকাতা: আধুনিক যুদ্ধে শুধু শক্তিশালী যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই হয় না, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল শত্রুকে যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করা। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সংঘাত দেখিয়েছে, আকাশপথে (Air Defense) হামলার বিরুদ্ধে সফল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হলে আগে থেকেই হুমকি চিহ্নিত করার সক্ষমতা থাকতে হবে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের একটি বহুল প্রচলিত কথা, “যাকে দেখা যায় না, তাকে আঘাতও করা যায় না।” সেই কারণেই ভারত এখন আকাশে নজরদারির ক্ষমতা বাড়াতে বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

Advertisements

সাধারণ স্থলভিত্তিক রাডারের একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাডারের তরঙ্গ সরলরেখায় চলাচল করে, ফলে পৃথিবীর বক্রতার কারণে নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন অনেক সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাডারের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। এই এলাকাকেই বলা হয় ‘রাডার শ্যাডো’। এর ফলে প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাতে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় অনেক কমে যায়।

   

এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হল রাডারকে মাটির বদলে আকাশে নিয়ে যাওয়া। আর সেই কাজই করে Airborne Early Warning and Control (AEW&C) ব্যবস্থা। অর্থাৎ, একটি বিশেষ বিমান আকাশে উড়তে উড়তেই শত শত কিলোমিটার দূরের আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং সম্ভাব্য হুমকির তথ্য মুহূর্তের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে পৌঁছে দেয়।

ভারতীয় বায়ুসেনার Phalcon AEW&C বিমান প্রায় ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে পারে। সেই উচ্চতা থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এর ফলে নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, ড্রোন বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অনেক আগেই শনাক্ত করা যায়। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা বা যুদ্ধবিমান উড়িয়ে বাধা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়।

Advertisements

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), উন্নত সেন্সর এবং আধুনিক কম্পিউটিং প্রযুক্তির যুগে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন শুধু লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাওয়াই নয়, দ্রুত তার অবস্থান নির্ধারণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং সমন্বিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। AEW&C বিমান কার্যত একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করে, যা বিভিন্ন সেন্সর, যুদ্ধবিমান এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত রাখে।

ভারতের ক্ষেত্রে এই সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশের ১৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি স্থলসীমান্ত এবং ১১ হাজার কিলোমিটারের বেশি উপকূলরেখা রয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য দুই-মুখী সংঘাতের আশঙ্কাও দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত বড় এলাকা সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখতে আকাশভিত্তিক রাডারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ভারতের হাতে মোট ছয়টি আকাশভিত্তিক নজরদারি বিমান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি দেশীয় Netra Mk-1 AEW&C, যা Embraer ERJ-145 বিমানের উপর তৈরি এবং তিনটি ইজরায়েলি Phalcon AWACS, যা রাশিয়ান Il-76 বিমানে বসানো হয়েছে। Netra Mk-1 চলতি বছরের জুন মাসে Final Operational Clearance (FOC) পেয়েছে এবং এখন পূর্ণমাত্রায় পরিষেবায় রয়েছে।

তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ছয়টি বিমান দিয়ে ভারতের মতো বিশাল আকাশসীমায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো সম্ভব নয়। তুলনায় চীনের কাছে ৩০টিরও বেশি AWACS রয়েছে এবং পাকিস্তানের হাতে প্রায় ১০টি AEW&C বিমান রয়েছে।

এই ঘাটতি দূর করতে ভারত বড় পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রথম ধাপে বায়ুসেনায় যুক্ত হবে ছয়টি Netra Mk-1A। এগুলিতে থাকবে Gallium Nitride (GaN) AESA Radar, যা প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারবে। পাশাপাশি উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা, স্টেলথ লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার ক্ষমতা এবং জ্যামিং প্রতিরোধের প্রযুক্তিও থাকবে। এই বিমানগুলির সরবরাহ ২০২৭-২০২৮ সালের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা।

একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে আরও উন্নত Netra Mk-2 AWACS। এই প্রকল্পে ছয়টি Airbus A321 বিমানকে উন্নত নজরদারি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা হচ্ছে। এতে থাকবে ৩৬০ ডিগ্রি রাডার কভারেজ, দীর্ঘক্ষণ আকাশে থাকার ক্ষমতা এবং আরও উন্নত কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯-৩০ সালে এর উড়ান পরীক্ষা শুরু হবে এবং ২০৩২ সাল থেকে পরিষেবায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের আকাশভিত্তিক নজরদারি বিমানের সংখ্যা ৬ থেকে বেড়ে ১৮-তে পৌঁছাবে। এর মধ্যে থাকবে তিনটি Netra Mk-1, ছয়টি Netra Mk-1A, ছয়টি Netra Mk-2 এবং তিনটি Phalcon AWACS।

তবে এই বিমানগুলি একা কাজ করবে না। এগুলিকে স্থলভিত্তিক দীর্ঘপাল্লার রাডার, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, উপগ্রহ এবং ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এই সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানগুলিও রিয়েল-টাইম তথ্য পাবে, ফলে পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অভিন্ন চিত্র তৈরি হবে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকের শুরুতেই ভারত আরও শক্তিশালী, সমন্বিত এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে। শত্রুর যুদ্ধবিমান, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র সীমান্তে পৌঁছানোর অনেক আগেই সেগুলিকে শনাক্ত করে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

Also Read | সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে ফের নজরে বাংলা! কালিকাপুরের মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার ৪০লক্ষ নগদ-১৮০ গ্রামের সোনার মুদ্রা

Also Read |  পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব

Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা

Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন

Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের

Advertisements