অস্তরাগ বনাম ভোরের আলো! এক স্নানের স্মৃতি আর এক মহাকাব্যের শেষ পাতা

বিশ্বকাপ ফাইনালে (World Cup Final) মুখোমুখি লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামাল। একদিকে বিদায়ের প্রহরে কিংবদন্তি, অন্যদিকে নতুন যুগের উত্থান, ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে ফুটবল বিশ্ব।

lionel-messi-vs-lamine-yamal-world-cup-final-generation-clash

বাবান আদক, কলকাতা ডেস্ক: মহাকাল চিত্রনাট্য বোধহয় এভাবেই লেখেন। তা না হলে, আঠারো বছর আগে তোলা একটা সাদাকালো বা সেপিয়া রঙা ফ্রেম আজ এমন এক মহাকাব্যের প্রচ্ছদ হয়ে উঠবে কেন? ২০০৭ সালের সেই দিনটার কথা ভাবুন। এক লাজুক তরুণ, যাঁর নিজেরই তখনও ঠিকমতো গোঁফ ওঠেনি, বার্সেলোনার এক রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে প্লাস্টিকের বাথটাবের জলে পরম আদরে স্নান করাচ্ছেন এক একরত্তিকে। সাবানের বুদবুদে সেদিন কি লেখা ছিল আজকের এই রক্তক্ষয়ী উপাখ্যানের বীজ?

Advertisements

আজ যখন পিছন ফিরে তাকানো যায়, মনে হয় যেন কোনও এক মায়াঘেরা উপন্যাসের শুরু হয়েছিল সেদিন। রবিবার রাতে, সেই মায়াই যখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবের রূপ নিয়ে বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় নেমে আসবে, তখন ফুটবল আর নিছক খেলা থাকবে না, হয়ে উঠবে মানুষের নিয়তি আর স্মৃতির এক তীব্র দ্বৈরথ।

   

লড়বে আর্জেন্টিনা আর স্পেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্যি হল লড়বে একটা অস্তরাগ আর একটা ভোরের আলো। লিয়োনেল মেসি আর লামিন ইয়ামাল। যে শিশুটির গায়ে এক দিন নিজের হাতে জল ঢেলে দিয়েছিলেন মেসি, আজ সেই শিশুই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ এবং শেষ স্বপ্নের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে।

উনচল্লিশের মেসি এখন যেন পাবলো নেরুদার কবিতার সেই বিষণ্ণ নাবিক, যিনি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর তাঁর শেষ বন্দরটির দিকে তাকিয়ে আছেন। শরীরে ক্লান্তি, পেশিতে বয়সের জং, তবু তাঁর বাঁ পায়ের তুলিতে এখনও বোনা হচ্ছে নিপুণ জ্যামিতিক নকশা। এই বিশ্বকাপে আটটি গোল আর চারটি অ্যাসিস্ট এ তো কোনও সাধারণ পরিসংখ্যান নয়। এ হল নিভতে বসা এক প্রদীপের শেষ, উজ্জ্বলতম শিখা। সোনার বল বা সোনার বুটের হাতছানি নয়, তিনি জানেন, এই গ্যালারির চিৎকার, এই ঘাসের গন্ধ, এই উন্মাদনা সব কিছুর সঙ্গে তাঁর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের প্রহর আসন্ন। কিন্তু সেই বিদায়ী সিম্ফনি শেষ হওয়ার আগে, নিয়তি এক অদ্ভুত দাবার চাল চেলে দিয়েছে। উল্টো দিকের রাজামশাইয়ের পাহারাদার আজ সেই ছেলেটি, যাকে তিনি এক দিন কোলে তুলে নিয়েছিলেন।

Advertisements

ইয়ামাল এখন স্প্যানিশ আর্মাডার সবচেয়ে ধারালো ফলা। তাঁর পায়ে যৌবনের সেই উদ্দাম স্রোত, যা কোনও বাঁধ মানে না, কোনও ইতিহাসকে তোয়াক্কা করে না। ফরাসিদের বাস্তিল দুর্গে সেমিফাইনালে সে যে ভাবে ফাটল ধরিয়েছে, তা দেখে মনে হয় যেন এক নতুন শতাব্দীর পদধ্বনি শুনছে ফুটবল বিশ্ব। এই ফাইনালে ইয়ামালের চোখে কোনও নস্টালজিয়া থাকবে না, থাকবে শুধু নিজের সাম্রাজ্য স্থাপনের এক আদিম ক্ষুধা। এক দিকে মেসির সেই শান্ত, পরিমিত দর্শন, আর অন্য দিকে ইয়ামালের একগুঁয়ে, বন্য ক্যানভাস। দুই প্রজন্মের এই মুখোমুখি দাঁড়ানো যেন কোনও এক ধ্রুপদী সিনেমার শেষ দৃশ্য, যেখানে অতীত আর ভবিষ্যতের মুখোমুখি সংঘাতে রচিত হয় নতুন এক ইতিহাস।

রবিবারের রাত যখন গভীর হবে, কোনও একটা দলের স্বপ্ন ভাঙবে। কিন্তু ফুটবলের এই মহাজাগতিক বৃত্তটা সেদিন সম্পূর্ণ হবে। হয়তো শেষ বাঁশি বাজার পর, ট্রফির উৎসব বা কান্নার মাঝে, সেই আঠারো বছর আগের বাথটাবের স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য হলেও ফিরে আসবে মেসির মনে। হয়তো ঘামে ভেজা ইয়ামালকে বুকে টেনে নেওয়ার সময় তিনি ফিসফিস করে বলবেন সময়ের সেই অমোঘ সত্য যা এক দিন শুরু হয়, তাকে এ ভাবেই শেষ হতে হয়। নিয়তির কাছে এ এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ। স্টেডিয়ামের শেষ আলোটা যখন নিভে যাবে, তখন পড়ে থাকবে শুধু দুটো মানুষের ছায়া আর এক অনন্ত নীরবতা, যা আমাদের বলে যাবে ফুটবল শুধু জেতার গল্প নয়, স্মৃতি আর স্বপ্নের কাছে হেরে যাওয়ার এক অপরূপ সুন্দর কবিতাও।

Also Read | সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে ফের নজরে বাংলা! কালিকাপুরের মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার ৪০লক্ষ নগদ-১৮০ গ্রামের সোনার মুদ্রা

Also Read |  পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব

Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা

Advertisements