ট্রাম্পের সামনে ‘Thucydides Trap’ নিয়ে শির বার্তা, সংঘাত এড়াতে আমেরিকা-চিনকে সহযোগিতার আহ্বান

আমেরিকা ও চিনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়লেও দুই দেশের সংঘাত অনিবার্য নয়, এমন বার্তাই দিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের…

xi-jinping-trump-thucydides-trap-us-china-conflict-cooperation

আমেরিকা ও চিনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়লেও দুই দেশের সংঘাত অনিবার্য নয়, এমন বার্তাই দিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে হোয়াইট হাউসের স্বাগত অনুষ্ঠানে শি বলেন, দুই দেশ চাইলে ইতিহাসে পরিচিত ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ (Thucydides Trap) এড়াতে পারে। তাঁর বক্তব্যে সহযোগিতা, নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা এবং মতপার্থক্য সামলানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

Advertisements

শি বলেন, আমেরিকা ও চিনের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত যেখানে দুই দেশ প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারে। চিনের “গ্রেট রিজুভেনেশন” এবং ট্রাম্পের “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন” লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়েও এগিয়ে যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, প্রতিযোগিতা যেন নিয়ন্ত্রিত থাকে, মতপার্থক্য যেন সামলানো যায় এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে।

   

কী এই ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’?

‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ শব্দবন্ধটি হার্ভার্ডের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন জনপ্রিয় করেন। এর ভিত্তি প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসের পেলোপনেশীয় যুদ্ধের বিশ্লেষণ। থুসিডিডিসের বর্ণনায়, প্রাচীন গ্রিসে এথেন্সের শক্তি বৃদ্ধি এবং স্পার্টার মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করেছিল। আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই ধারণাকে ব্যবহার করে বোঝানো হয়, কোনও নতুন শক্তি দ্রুত উত্থান ঘটালে প্রতিষ্ঠিত শক্তির সঙ্গে তার সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অ্যালিসনের বিশ্লেষণে ১৬টি ঐতিহাসিক উদাহরণের মধ্যে ১২টি যুদ্ধের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল বলে তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। তবে এই ধারণা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকদের মধ্যে বিতর্কও রয়েছে। একে সরল ঐতিহাসিক নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।

Advertisements

শি কেন এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করলেন?

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে শি জিনপিং বলেন, থুসিডিডিস ট্র্যাপ “অতিক্রম করা সম্ভব”। এর মাধ্যমে তিনি মূলত আমেরিকা ও চিনের বর্তমান প্রতিযোগিতাকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে পরিণত না করার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছেন। শির বক্তব্যে চিনের উত্থানকে আমেরিকার জন্য সরাসরি ক্ষতি হিসেবে দেখার পরিবর্তে দুই দেশের পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তিনি দুই দেশকে “পার্টনার, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়” হিসেবে সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানান। চিনের সরকারি বক্তব্যেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে মূল ভিত্তি, নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, সামলানো যায় এমন মতপার্থক্য এবং শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ

শির বক্তব্যের আগে ও পরে ট্রাম্পের আচরণেও তুলনামূলকভাবে উষ্ণ কূটনৈতিক সুর দেখা যায়। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে শিকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা জানান ট্রাম্প। দুই নেতার বৈঠকের আগে বিশাল সামরিক ও রাষ্ট্রীয় আয়োজন করা হয়। ট্রাম্প প্রকাশ্যে শিকে “গ্রেট লিডার” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দুই দেশের নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও বলেন। তবে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্য, শুল্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত প্রযুক্তি, বিরল খনিজ, তাইওয়ান এবং ইরান পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের স্বার্থ এক নয়। ফলে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের উষ্ণতার সঙ্গে বাস্তব কূটনৈতিক আলোচনার জটিলতাও পাশাপাশি রয়েছে।

আমেরিকার দৃষ্টিতে চিন নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে

ওয়াশিংটনে চিনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখার পক্ষে যুক্তি থাকলেও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চিনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ান, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান ট্রাম্প-শি বৈঠকের আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যেও এই ক্ষেত্রগুলি গুরুত্বপূর্ণ বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও জানিয়েছেন, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা ও চিনের সম্পর্ক একবিংশ শতাব্দীর গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাণিজ্য থেকে এআই, একাধিক ইস্যুতে আলোচনা

ট্রাম্প ও শির বর্তমান বৈঠকের সামনে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিও বড় বিষয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখা, শুল্ক সংক্রান্ত বিরোধ, বিরল খনিজ সরবরাহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা আলোচনায় রয়েছে। এআই নিয়েও দুই দেশের মধ্যে একদিকে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য এআই-সংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

তাইওয়ান এবং ইরান পরিস্থিতিও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শির ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ প্রসঙ্গকে শুধু একটি ঐতিহাসিক উপমা হিসেবে দেখলে বর্তমান আলোচনার সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যাবে না।

ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

আমেরিকা ও চিনের সম্পর্কের এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দুই বড় শক্তির মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন হলে তার প্রভাব এশিয়ার অর্থনীতি ও কৌশলগত পরিবেশে পড়তে পারে।

বর্তমানে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সরাসরি যোগাযোগও চলছে। ফলে আগামী দিনে সম্পর্কটি সংঘাতের দিকে যায়, নাকি নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার নতুন কাঠামো তৈরি করে, সেটি নজরে রাখার মতো বিষয়।

শি জিনপিংয়ের ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ প্রসঙ্গ সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। দুই দেশের নেতারা সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার কথা বললেও বাণিজ্য, এআই, তাইওয়ান, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বাস্তব মতপার্থক্য এখনও রয়েছে।

Advertisements