মার্কিন সেনাবাহিনী (US Army) এবার প্রশিক্ষণের সময় সৈন্যরা কীভাবে অস্ত্র ব্যবহার করছে, তা আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্য নিতে চলেছে। এই উদ্যোগের জন্য আর্মামেন্টস রিসার্চ কোম্পানি বা এআরসি-কে ৪.৭ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি দিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। ১২ মাসের এই চুক্তির লক্ষ্য হল এআই-চালিত অস্ত্র সেন্সরকে সরাসরি সেনাবাহিনীর লাইভ সমন্বিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা।
এই প্রযুক্তি কার্যকর হলে প্রশিক্ষণের সময় কোনও ইউনিট কীভাবে অস্ত্র ব্যবহার করছে, কোথায় কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং পুরো অভিযানে অস্ত্রের ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, তার আরও পরিমাপযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করবে সেন্সর
চুক্তিটির আওতায় এআরসির এআই-চালিত উইপন সেন্সর বা এডব্লিউইএসকে মার্কিন সেনাবাহিনীর লাইভ ট্রেনিং এনভায়রনমেন্ট এবং ট্যাকটিক্যাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। বর্তমানে সামরিক প্রশিক্ষণের সময় কমান্ডার এবং অবজারভার কন্ট্রোলার বা ট্রেনাররা সৈন্যদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু একটি বড় আকারের মহড়ায় প্রতিটি অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তার সম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। নতুন ব্যবস্থায় অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত সেন্সর সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করতে পারবে। এর ফলে অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা শুধু পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর না করে ডেটার মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
মহড়ার পর বিশ্লেষণ আরও বিস্তারিত হতে পারে
বড় আকারের সামরিক প্রশিক্ষণের সময় এডব্লিউইএস থেকে পাওয়া তথ্য সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পাঠানো হবে। সেই ডেটা ব্যবহার করে কমান্ডার ও প্রশিক্ষকরা একটি কমন অপারেটিং পিকচার তৈরি করতে পারবেন। এর পাশাপাশি মহড়া শেষ হওয়ার পর আফটার অ্যাকশন রিভিউ বা এএআর-এর সময়ও এই তথ্য কাজে লাগতে পারে। কোন পর্যায়ে কী ঘটেছিল, কোন অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং ইউনিটের পারফরম্যান্সে কোথায় উন্নতির প্রয়োজন, তা আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এআরসির দাবি, এই প্রয়োজনটি মার্কিন সেনাবাহিনীর ট্যাকটিক্যাল ইউনিটগুলির অপারেশনাল ভ্যালিডেশনের মাধ্যমে সামনে এসেছিল। অর্থাৎ বাস্তব প্রশিক্ষণ পরিস্থিতিতে আরও নির্ভুল এবং নিরপেক্ষ ডেটা পাওয়ার প্রয়োজন থেকেই এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অস্ত্রকে নেটওয়ার্কড সেন্সরে পরিণত করার লক্ষ্য
এআরসি জানিয়েছে, তাদের এআই-চালিত উইপন সেন্সর ব্যবস্থা অস্ত্রের সঙ্গে সেন্সর, ডেটা প্রসেসিং এবং এআই-ভিত্তিক অ্যানালিটিক্সকে একত্র করে। কোম্পানির বৃহত্তর প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হল পৃথক অস্ত্রকেও নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সেন্সরে পরিণত করা। এর সম্ভাব্য ব্যবহার প্রশিক্ষণ উন্নত করা, পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, ভবিষ্যৎ লজিস্টিক প্রয়োজন অনুমান এবং অস্ত্র বা সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন আগে থেকে চিহ্নিত করার মতো কাজে হতে পারে। তবে বর্তমান ৪.৭ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির মূল লক্ষ্য হল লাইভ সমন্বিত সামরিক প্রশিক্ষণে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
প্রশিক্ষণের সরঞ্জাম আর যুদ্ধক্ষেত্রের সরঞ্জামের মধ্যে পার্থক্য কমানোর চেষ্টা
এআরসির অন্যতম লক্ষ্য হল প্রশিক্ষণের সময় ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং বাস্তব অভিযানে সৈন্যদের সঙ্গে থাকা প্রযুক্তির মধ্যে পার্থক্য কমানো। কোম্পানির মতে, তাদের মডিউলার এবং ওপেন-সিস্টেম পদ্ধতি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেন্সর প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আনার সুযোগ দেবে। একই ধরনের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের সময় এবং বাস্তব অভিযানের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা গেলে সৈন্যরা একই ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত থাকতে পারবেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর সিপিই এসটি৩-এর বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গেও এই পরিকল্পনার মিল রয়েছে। সংস্থাটি লাইভ, ভার্চুয়াল এবং কনস্ট্রাকটিভ প্রশিক্ষণকে আরও সংযুক্ত করার জন্য এআই-নির্ভর ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
এর আগেও মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছে এআরসি
এআরসি এর আগে এআই-ভিত্তিক অস্ত্র সেন্সিং প্রযুক্তি নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছে। ছোট ইউনিটের রিসাপ্লাই এবং বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কাজেও কোম্পানিটির প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২৫ সালের এক্সটেক কাউন্টারস্ট্রাইক প্রতিযোগিতাতেও এআরসির প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়েছিল। ওই প্রতিযোগিতার অন্যতম বিষয় ছিল কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি।
এবারের নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এআই-চালিত অস্ত্র সেন্সরকে আরও বড় পরিসরের লাইভ সামরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এআরসির সিইও মাইক ক্যান্টি জানিয়েছেন, যোদ্ধারা এমন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চান, যা প্রশিক্ষণের সময় তাঁদের সঙ্গে থাকে এবং বাস্তব অভিযানের ক্ষেত্রেও একই প্রযুক্তি কাজে লাগানো যায়।
এখনও কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়নি
৪.৭ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি ঘোষণা হলেও মার্কিন সেনাবাহিনী বা এআরসি এখনও জানায়নি, ঠিক কোন কোন অস্ত্রে এই সেন্সর বসানো হবে। কতগুলি সিস্টেমে প্রযুক্তিটি যুক্ত করা হবে এবং প্রশিক্ষণের ডেটা বিশ্লেষণে কোন নির্দিষ্ট এআই মডেল ব্যবহার করা হবে, সেই তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
তবে পরিকল্পনাটি সফল হলে সামরিক প্রশিক্ষণে অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। একজন সৈন্য বা একটি অস্ত্র কী করেছে, সেই স্তরের তথ্যকে একটি গোটা ইউনিটের পারফরম্যান্স এবং প্রশিক্ষণের প্রস্তুতির বৃহত্তর ছবির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ফলে ভবিষ্যতের মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণে শুধু প্রশিক্ষকের পর্যবেক্ষণ নয়, অস্ত্র থেকে সংগৃহীত রিয়েল-টাইম ডেটা এবং এআই বিশ্লেষণও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশিক্ষণ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।
