সৌদিকে ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ দিতে চায় আমেরিকা, কেন উদ্বিগ্ন ইজরায়েল?

সৌদি আরবকে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি অনুমোদন করেছে আমেরিকা। কেন উদ্বিগ্ন ইজরায়েল ও মার্কিন নিরাপত্তা মহল?

trump-saudi-f35-deal-israel-china-concerns

নয়াদিল্লি: মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে আমেরিকার একটি প্রস্তাবিত অস্ত্র চুক্তি (Saudi F-35 deal)। ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং ৪৯টি ইঞ্জিন বিক্রির সম্ভাব্য চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। পুরো প্যাকেজটির আনুমানিক মূল্য ২৪.৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত চুক্তি নয়। মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা এখনও বাকি রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে সৌদি আরব হবে মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় দেশ, যারা এফ-৩৫ পরিচালনা করবে। বর্তমানে এই অঞ্চলে ইজরায়েলই একমাত্র দেশ, যারা এই পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে।

Advertisements

সৌদির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এফ-৩৫?

এফ-৩৫ আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলির অন্যতম। স্টেলথ প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধক্ষমতার সমন্বয়ে তৈরি এই বিমান আধুনিক বিমানযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে সৌদি বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। রিয়াধের দিক থেকে এটি শুধু নতুন যুদ্ধবিমান কেনা নয়, আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করারও একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালেই ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে আলাদা একটি ১৪২ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা প্যাকেজে সম্মতি দিয়েছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। নতুন এফ-৩৫ প্রস্তাব সেই বৃহত্তর মার্কিন-সৌদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

   

Read More: ২৫ সেপ্টেম্বর আসছে Tata Aeris, টিগর ফেসলিফটে নতুন ডিজাইন ও ফিচার

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য

প্রস্তাবিত চুক্তিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে এর প্রভাব। ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ, অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় উন্নত সামরিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বজায় রাখাকে নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে। সৌদি আরব এফ-৩৫ পেলে এই ভারসাম্য কতটা বদলাতে পারে, সেটিই আলোচনার অন্যতম বিষয়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট অবশ্য জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সরঞ্জাম ও সহায়তা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করবে না।

Advertisements

আরও একটি বিষয় হল, সৌদি আরবকে দেওয়া এফ-৩৫-এর কনফিগারেশন ইজরায়েলের ব্যবহৃত এফ-৩৫আই-এর মতো নাও হতে পারে। ইজরায়েলের বিমানগুলিতে দেশটির নিজস্ব কিছু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত সংযোজন রয়েছে। ফলে একই এফ-৩৫ প্ল্যাটফর্ম হলেও দুই দেশের যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা একেবারে একই হবে না।

Read More: ভলভো কারসের নতুন সিইও ক্লাউস জেলমার, ২০২৭ থেকে দায়িত্ব নেবেন

চিনের সঙ্গে সৌদির সম্পর্কও বড় প্রশ্ন

চুক্তি নিয়ে আমেরিকার নিরাপত্তা মহলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হল চিনের সঙ্গে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক। সৌদি আরবের সঙ্গে চিনের বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেড়েছে। ফলে অত্যন্ত সংবেদনশীল এফ-৩৫ প্রযুক্তি চিনের হাতে পরোক্ষভাবে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন নিরাপত্তা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

এফ-৩৫ শুধু একটি যুদ্ধবিমান নয়। এর স্টেলথ ব্যবস্থা, সেন্সর, সফটওয়্যার এবং অন্যান্য প্রযুক্তি মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। তাই বিমানটি যে দেশে মোতায়েন হবে, সেই দেশের সঙ্গে তৃতীয় কোনও দেশের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, সেটিও ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ সামনে এসেছিল। আমিরশাহির এফ-৩৫ কেনার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। চিনের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং মার্কিন প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সেই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কংগ্রেসের অনুমোদন এখনও বাকি

মার্কিন প্রশাসন সম্ভাব্য বিক্রির অনুমোদন দিলেও এখানেই প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। মার্কিন কংগ্রেস এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। আইনপ্রণেতারা চাইলে চুক্তি নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন। ফলে ইজরায়েলের সামরিক সুবিধা, চিনের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক, মার্কিন প্রযুক্তির নিরাপত্তা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, সবকিছুই কংগ্রেসের আলোচনায় আসতে পারে।

অর্থাৎ প্রশাসনের অনুমোদন মানেই সৌদি আরবের হাতে দ্রুত এফ-৩৫ পৌঁছে যাবে, এমন নয়। উৎপাদন এবং সরবরাহের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এফ-৩৫ উৎপাদন ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অর্ডার রয়েছে বলে ডেলিভারি টাইমলাইনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

ইজরায়েলের উদ্বেগ কোথায়?

ইজরায়েলের উদ্বেগ মূলত দুটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত। প্রথমত, সৌদি আরবের হাতে এফ-৩৫ গেলে মধ্যপ্রাচ্যে অত্যাধুনিক স্টেলথ যুদ্ধবিমানের ব্যবহারকারী দেশের সংখ্যা বাড়বে। এতে আঞ্চলিক সামরিক সমীকরণ বদলাতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েল এবং সৌদি আরবের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে, সেটিও অনিশ্চিত। তাই কোনও দেশের বর্তমান সম্পর্কের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও ইজরায়েলের এই উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।

তবে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, মার্কিন প্রশাসনের সরকারি অবস্থান হল প্রস্তাবিত বিক্রির ফলে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য নষ্ট হবে না। ফলে একই চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটনের সরকারি অবস্থান এবং ইজরায়েল ও মার্কিন নিরাপত্তা মহলের উদ্বেগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

চুক্তি হলে মধ্যপ্রাচ্যে কী পরিবর্তন হতে পারে?

এফ-৩৫ চুক্তি কার্যকর হলে সৌদি আরবের বিমানবাহিনীতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান যুক্ত হবে। একই সঙ্গে আমেরিকা ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাত্রাও আরও বাড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে সৌদি আরবকে কোন কনফিগারেশনের এফ-৩৫ দেওয়া হবে, কী ধরনের অস্ত্র ও সহায়ক ব্যবস্থা সরবরাহ করা হবে, প্রশিক্ষণ কীভাবে হবে এবং কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয় তার উপর।

এই মুহূর্তে তাই ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ চুক্তিকে চূড়ান্ত অস্ত্র সরবরাহ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এটি একটি সম্ভাব্য বিক্রি, যার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া এখনও বাকি।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories — On Kolkata24x7 Business.

Advertisements