কলকাতা ডেস্ক: আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। সোমবার নিজের অবসরের কথা জানিয়ে আবেগঘন বার্তা দেন ৩৯ বছর বয়সি এই ফুটবলার। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলা এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
মেসির এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তাঁর অসংখ্য সমর্থক হতবাক এবং আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাঁদের প্রিয় ফুটবলারের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
মেসি নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, “এটা এমন একটি সিদ্ধান্ত যা আমাকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনও ভিতর থেকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।”
বাবার মৃত্যুর পর আরও দৃঢ় সিদ্ধান্ত
অবসরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজের বাবার মৃত্যুর বিষয়টিও যুক্ত করেছেন মেসি। তিনি জানিয়েছেন, বাবার মৃত্যুর পর এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে।মেসি জানিয়েছেন, অবসরের কথা তিনি প্রথম লিখেছিলেন ২১ জুলাই, বিশ্বকাপের ফাইনালের দুই দিন পর। কিন্তু পরে বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর তিনি আগের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আরও নিশ্চিত হন। তিনি লিখেছেন, “আজ, আমার বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত যে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।”
‘আমি সবসময় সবকিছু দিয়েছি’
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা স্মরণ করে মেসি জানিয়েছেন, দলের জার্সির জন্য তিনি সবসময় নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন। তাঁর কথায়, শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যখন আর্জেন্টিনা সবকিছু জিতেছে, তখন নয়, তারও অনেক আগে থেকে তিনি জাতীয় দলের জন্য লড়াই করেছেন। মেসি বলেছেন, আর্জেন্টিনার জার্সি পরে দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়া এবং তাঁদের গর্বিত করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। তিনি আরও জানান, তাঁর সামনে আর খুব বেশি সময় নেই এবং জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। জাতীয় দলের অধ্যায়টি শেষ করা তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টের।
‘আমি সবসময় আর্জেন্টিনা দলের অংশ হতে ভালোবাসব’
মেসি জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অংশ হওয়া তিনি ভালোবাসেন এবং ভবিষ্যতেও ভালোবাসবেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি দলের জন্য নিজের যা দেওয়ার ছিল, সব দিয়েছেন। এখন আর তাঁর দেওয়ার মতো কিছু বাকি নেই। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের কথাও উল্লেখ করেছেন মেসি। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনায় বেশ কিছু প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার উঠে আসছেন, যারা জাতীয় দলে থাকার যোগ্য।
২০ বছরের ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ
আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায় দুই দশকের যাত্রায় সমর্থকদের ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। তিনি লিখেছেন, “এই ২০ বছর ধরে আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ।” জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার সময় গ্যালারির সমর্থকদের আওয়াজ আর শুনতে পারবেন না, সেটিও তাঁকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। মেসি জানিয়েছেন, এবার থেকে তিনি বাইরে থেকে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন। ভালো সময়ের পাশাপাশি খারাপ সময়ে আরও বেশি করে দলের পাশে থাকার কথা বলেছেন তিনি।
পরিবার, সতীর্থ ও কোচদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
নিজের পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। এই দীর্ঘ এবং কঠিন যাত্রায় পরিবার সবসময় তাঁর পাশে ছিল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের কেরিয়ারে যাঁদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, সেই সব কোচ, সতীর্থ এবং কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তাঁর কথায়, এই যাত্রা যেমন সুন্দর ছিল, তেমনই কঠিনও ছিল। তবে এই সময়ের অসংখ্য স্মৃতি এবং মুহূর্ত তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন।
‘আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা বাস্তব করেছি’
মেসি বলেছেন, সতীর্থদের সঙ্গে মিলে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, যেগুলির স্বপ্ন তাঁরা একসময় দেখতেন। এই পুরো অভিজ্ঞতাকে তিনি অবিশ্বাস্য বলে বর্ণনা করেছেন। সতীর্থদের সঙ্গে একসঙ্গে এই সাফল্য অনুভব করার সুযোগ তাঁর কাছে বিশেষ ছিল। শেষে আর্জেন্টিনার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, “আমি তোমাদের ভালোবাসি!” এর পরেই আসে তাঁর আবেগঘন দেশপ্রেমের বার্তা, “আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে তৈরি করার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।” শেষে তিনি লেখেন, “ভামোস আর্জেন্টিনা!”
‘এ যেন এক যুগের শেষ’
মেসির অবসরের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভক্তদের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এত দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শেষ এসে গিয়েছে। এক সমর্থক লিখেছেন, “এটা সত্যি নয়। সে এভাবে অবসর নিতে পারে না।” কান্নার ইমোজি দিয়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
অন্য এক ভক্ত মেসির পুরো কেরিয়ার দেখার সুযোগ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর কেরিয়ার দেখার অভিজ্ঞতার জন্য দুঃখের মধ্যেও কৃতজ্ঞ তিনি। আরেকজন লিখেছেন, “সত্যিই একটি যুগের শেষ। তাঁর মতো আর কোনও খেলোয়াড়কে আমরা দেখতে পাব না।”
অন্য এক সমর্থক মেসিকে সর্বকালের সেরা বা জিওএটি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর কেরিয়ারের জন্য একটি ‘কাব্যিক সমাপ্তি’র কথা বলেছেন। একই সঙ্গে প্রিয় তারকাকে মিস করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মেসির শেষ বার্তায় আবেগ ও গর্ব
মেসির বিদায়বার্তায় যেমন রয়েছে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শেষ করার কষ্ট, তেমনই রয়েছে গর্ব। আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি যা কিছু অর্জন করেছেন, সতীর্থদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া সেই সাফল্য এবং সমর্থকদের ভালোবাসার কথাই বারবার উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি টানার সময় মেসি জানিয়েছেন, তিনি শান্তি এবং গর্ব নিয়ে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় দলের জার্সির জন্য নিজের সবকিছু দেওয়ার পর এখন সেই জার্সি অন্য এক প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। আর সেই কারণেই মেসির এই অবসর শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়, তাঁর কোটি কোটি সমর্থকের কাছে এটি প্রিয় এক যুগের সমাপ্তি।
