কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল প্রশিক্ষণে কপিরাইট সুরক্ষিত উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে অ্যানথ্রপিকের (Anthropic) বিরুদ্ধে মামলা করল সোনি মিউজিক পাবলিশিং এবং ওয়ার্নার চ্যাপেল মিউজিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অনুমতি ছাড়াই বিপুল পরিমাণ কপিরাইট সুরক্ষিত বই, গানের কথা এবং অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করে অ্যানথ্রপিক তার এআই সহকারী ক্লদ প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেছে।
মামলায় অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দারিও আমোদেই এবং বেঞ্জামিন ম্যান-কেও ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলাটি এআই সংস্থাগুলির প্রশিক্ষণ তথ্য সংগ্রহ এবং কপিরাইট ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে বড় ধরনের আইনি প্রভাব ফেলতে পারে।
কোথায় মামলা হয়েছে?
মিউজিক বিজনেস ওয়ার্ল্ডওয়াইড প্রথম এই মামলার খবর প্রকাশ করে। এরপর জানা যায়, সোনি মিউজিক এবং ওয়ার্নার চ্যাপেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে ডিভিশনে অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
মিউজিক পাবলিশারদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যানথ্রপিক বেআইনিভাবে কপিরাইট সুরক্ষিত উপাদান সংগ্রহ করেছে এবং সেই উপাদানকে তার পরবর্তী প্রজন্মের এআই সহকারী ক্লদ-এর প্রশিক্ষণে ইনপুট হিসেবে ব্যবহার করেছে। মামলায় অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক সম্পত্তি চুরির অভিযোগও আনা হয়েছে।
পাঁচ মিলিয়ন বই ডাউনলোডের অভিযোগ
মামলার অভিযোগপত্রে অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেঞ্জামিন ম্যানকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সালে ম্যান লাইব্রেরি জেনেসিস থেকে অন্তত ৫০ লাখ বা পাঁচ মিলিয়ন পাইরেটেড বই ডাউনলোড করেছিলেন। এখানেই অভিযোগ থেমে থাকেনি। সোনি মিউজিক এবং ওয়ার্নার চ্যাপেলের দাবি, ২০২২ সালে অ্যানথ্রপিকের কর্মীরা পাইরেট লাইব্রেরি মিরর থেকে আরও অন্তত ২০ লাখ বা দুই মিলিয়ন বই ডাউনলোড করেছিলেন। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বইগুলি এআই মডেল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
বিটটরেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ
মামলায় আরও দাবি করা হয়েছে, অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বেঞ্জামিন ম্যান বিটটরেন্ট ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক পাইরেটেড বই ডাউনলোড করেছিলেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ম্যান অ্যানথ্রপিকের হয়ে বুকস৩ লাইব্রেরি থেকে পাইরেটেড বইয়ের কপি সংগ্রহ করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, উদ্দেশ্য ছিল বইগুলির জন্য অর্থ ব্যয় না করে সেগুলি সংগ্রহ করা এবং ভবিষ্যতে বড় ভাষা মডেল বা এলএলএম প্রশিক্ষণসহ অন্য কোনো কাজে সেগুলি ব্যবহার করা যেতে পারে কি না, তা দেখা। অভিযোগকারীরা এই ঘটনাগুলিকে অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরে কপিরাইটযুক্ত উপাদান সংগ্রহের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
গানের কথাও স্ক্র্যাপ করার অভিযোগ
শুধু বই নয়, মিউজিক পাবলিশারদের কপিরাইট সুরক্ষিত গানের কথাও অ্যানথ্রপিক সংগ্রহ করেছে বলে অভিযোগ করেছে সোনি মিউজিক ও ওয়ার্নার চ্যাপেল। অভিযোগ অনুযায়ী, অ্যানথ্রপিক মিউজম্যাচ এবং লিরিকফাইন্ড-এর মতো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওয়েবসাইট থেকে গানের কথা ‘স্ক্র্যাপ’ করেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই গানের কথাগুলিও অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ডেটাসেটের অংশ হয়েছে।
কোন কোন গান নিয়ে অভিযোগ?
মামলার অভিযোগপত্রে অ্যানথ্রপিকের প্রশিক্ষণ তথ্যের মধ্যে বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ‘এন্ট নো মাউন্টেন হাই এনাফ’
- ‘অল আই ওয়ান্ট ফর ক্রিসমাস ইজ ইউ’
- ‘আই অব দ্য টাইগার’
- ‘হিয়ার কামস সান্তা ক্লজ’
- ‘পেপার রিংস’
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, কপিরাইট মালিকদের অনুমতি ছাড়াই এই ধরনের কাজ প্রশিক্ষণ তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা কপিরাইট আইনের আওতায় পড়তে পারে।
কমন ক্রল, দ্য পাইল ও বুকস৩ নিয়েও অভিযোগ
অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ তথ্য স্ক্র্যাপ এবং সংগ্রহের অভিযোগ তুলেছে মিউজিক পাবলিশাররা। মামলায় কমন ক্রল, দ্য পাইল এবং বুকস৩-এর মতো ডেটাসেটের উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিক লক্ষ লক্ষ পুরনো বা দ্বিতীয় হাতের বই স্ক্যান করেছে। অভিযোগকারীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘ডেস্ট্রাক্টিভ স্ক্যানিং’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, কপিরাইট সুরক্ষিত বইয়ের বিপুল সংখ্যক কপি সংগ্রহ করে সেগুলিকে ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তর করা হয়েছে এবং সেই তথ্য এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতি কাজের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দাবি
মামলায় সোনি মিউজিক পাবলিশিং এবং ওয়ার্নার চ্যাপেল মিউজিক বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তারা প্রতি লঙ্ঘিত কাজের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা প্রায় ১.৪৩ কোটি টাকা, দাবি করেছে। এর পাশাপাশি কপিরাইট আইনের প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ডলার, যা প্রায় ২৩.৮০ কোটি টাকা, দাবি করা হয়েছে। তবে আদালত শেষ পর্যন্ত কত টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করবে, তা মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
সব কপিরাইটযুক্ত কপি ধ্বংসের দাবি
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মামলাকারীরা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছে। তারা আদালতের তত্ত্বাবধানে অ্যানথ্রপিকের কাছে থাকা মিউজিক পাবলিশারদের কপিরাইট সুরক্ষিত কাজের সমস্ত লঙ্ঘনকারী কপি ধ্বংস করার নির্দেশ চেয়েছে। এর পাশাপাশি অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল কী ধরনের প্রশিক্ষণ তথ্য ব্যবহার করেছে, তার বিস্তারিত হিসাব দেওয়ারও দাবি করা হয়েছে। মামলাকারীরা অ্যানথ্রপিকের এআই মডেলের পরিচিত সক্ষমতা সম্পর্কেও তথ্য চেয়েছে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণের জন্য কী ধরনের ডেটা ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই প্রশিক্ষণের ফলে মডেল কী ধরনের কাজ করতে সক্ষম হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
এআই প্রশিক্ষণ ও কপিরাইট নিয়ে নতুন বিতর্ক
এই মামলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে কপিরাইট আইনের সংঘাতকে আরও সামনে নিয়ে এল। বড় ভাষা মডেল তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই তথ্যের মধ্যে কপিরাইট সুরক্ষিত বই, গান, ছবি বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজ থাকলে সেগুলি কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আইনি ও শিল্পক্ষেত্রে বিতর্ক চলছে।
সোনি মিউজিক ও ওয়ার্নার চ্যাপেলের মামলায় মূল অভিযোগ হল, অ্যানথ্রপিক অনুমতি ছাড়াই বিপুল পরিমাণ কপিরাইট সুরক্ষিত উপাদান সংগ্রহ করে তা ক্লদ এআই মডেল তৈরিতে ব্যবহার করেছে।
অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলি আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন নয়। মামলাটি এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে এই মামলা এআই সংস্থাগুলির প্রশিক্ষণ ডেটা সংগ্রহ, কপিরাইট মালিকদের অধিকার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের আইনি কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে পারে।
