কলকাতা: ভারতের বাজারে কিছু গাড়ি আসে শুধুমাত্র সংস্থার পোর্টফোলিওর একটি খালি জায়গা পূরণ করতে। আবার কিছু গাড়ি আসে এমন সম্ভাবনা নিয়ে, যা পুরো ব্র্যান্ড সম্পর্কে ক্রেতাদের ধারণাই বদলে দিতে পারে। Kia Sorento দ্বিতীয় ধরনের গাড়ি হয়ে উঠতে পারে।
উত্তর আমেরিকায় Sorento Hybrid চালানোর অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নজরে পড়ে, তা হল গাড়িটির ভারসাম্য। এটি শুধু বড় SUV হওয়ার চেষ্টা করে না। বরং তিন সারির আসন, প্রিমিয়াম কেবিন, উন্নত প্রযুক্তি, অল-হুইল ড্রাইভ এবং হাইব্রিড পাওয়ারট্রেনের দক্ষতাকে একসঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করে। এবার ৪ সেপ্টেম্বর ভারতে Sorento লঞ্চ করতে চলেছে Kia। তাই প্রশ্নটা শুধু গাড়িটি কতটা ভালো, তা নয়। আসল প্রশ্ন হল, ভারতের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক SUV বাজারে Kia এই গাড়ির মাধ্যমে ঠিক কী অর্জন করতে চাইছে।
Seltos-এর পর এবার আরও বড় লক্ষ্য Kia-র
ভারতে Kia-র সাফল্যের পিছনে মূল ভূমিকা রয়েছে Seltos, Sonet এবং Carens-এর মতো মডেলের। সংস্থাটি খুব দ্রুত ভারতীয় বাজারে জায়গা করে নিয়েছিল আকর্ষণীয় ডিজাইন, প্রচুর ফিচার এবং তুলনামূলক প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা দেওয়ার মাধ্যমে। তবে এতদিন Kia-র পোর্টফোলিওতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা খালি ছিল।
একদিকে মূলধারার ক্রেতাদের জন্য Seltos, অন্যদিকে প্রিমিয়াম ইলেকট্রিক গাড়ির জায়গায় EV6। কিন্তু Seltos-এর উপরে এমন কোনও ঐতিহ্যবাহী ফ্ল্যাগশিপ SUV ছিল না, যা তিন সারির প্রিমিয়াম SUV ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পারে। Sorento সেই জায়গাটিই পূরণ করতে পারে। সম্ভাব্য ৪০-৪৫ লাখ টাকা দামের মধ্যে গাড়িটি এলে Skoda Kodiaq, Jeep Meridian এবং Toyota Fortuner-এর মতো মডেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে। তবে Sorento-র প্যাকেজ অন্যরকম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন
Sorento-র সবচেয়ে বড় অস্ত্র ইঞ্জিন
Sorento-র ডিজাইন, প্রযুক্তি কিংবা সাত আসনের কেবিন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতের জন্য গাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে এর হাইব্রিড পাওয়ারট্রেন। ভারতীয় মডেলে প্রায় ১.৬ লিটারের টার্বো-পেট্রল হাইব্রিড ইঞ্জিন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি প্রায় ২৩৫-২৩৮ বিএইচপি শক্তি এবং ৩৮০ এনএম টর্ক উৎপাদন করতে পারে। শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে এটি হয়তো অত্যন্ত বিপ্লবী মনে হবে না। বিশেষ করে ডিজেল SUV-গুলি যখন প্রচুর টর্ক দিতে পারে। কিন্তু Sorento-র আসল বিষয়টি হল দক্ষতা এবং ব্যবহারযোগ্যতার সমন্বয়।
ভারতের SUV বাজারে এখন একটি আকর্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্রেতাই ডিজেলের বিকল্প খুঁজছেন। কিন্তু বড় SUV, হাইওয়ে ড্রাইভিং এবং দীর্ঘ দূরত্বের পারিবারিক যাত্রার ক্ষেত্রে পুরোপুরি ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে এখনও অনেকের দ্বিধা রয়েছে। সেখানেই হাইব্রিড প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ডিজেল ছাড়তে চান, কিন্তু EV-তে যেতে প্রস্তুত নন?
Toyota ইতিমধ্যেই ভারতে শক্তিশালী হাইব্রিড প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। কিন্তু বড় SUV-তে এমন হাইব্রিড প্যাকেজ তৈরি করা, যা একইসঙ্গে ভালো পারফরম্যান্স, দক্ষতা এবং ব্যবহারিক সুবিধা দিতে পারে, এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। Sorento সেই জায়গায় এগিয়ে থাকতে পারে।
উত্তর আমেরিকায় হাইব্রিড Sorento-র অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর মসৃণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল পাওয়ারট্রেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, হাইব্রিড ব্যবহারের জন্য চালককে নিজের অভ্যাস খুব বেশি পরিবর্তন করতে হয় না। গাড়িতে জ্বালানি ভরুন, স্বাভাবিকভাবে চালান এবং হাইব্রিড প্রযুক্তির কারণে উন্নত দক্ষতার সুবিধা নিন। ডিজেল SUV থেকে অন্য প্রযুক্তিতে যেতে চাইছেন এমন ভারতীয় ক্রেতাদের কাছে এই বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয় হতে পারে।
প্রিমিয়াম, কিন্তু অযথা জটিল নয়
আজকাল অনেক প্রিমিয়াম SUV-তে একের পর এক স্ক্রিন, প্রযুক্তি এবং জটিল ফিচার যোগ করা হচ্ছে। ফলে গাড়ির কেবিন অত্যন্ত আধুনিক হলেও অনেক সময় ব্যবহারকারীর কাছে তা অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল মনে হতে পারে। Sorento তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ প্যাকেজ দেওয়ার চেষ্টা করে। গাড়িতে রয়েছে দুটি ১২.৩ ইঞ্চির ডিসপ্লে, কানেক্টেড ফিচার, উন্নত ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা এবং Kia-র AI Assistant।
তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি কেবিনের ব্যবহারিক দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় পরিবারগুলির কাছে শুধু ইঞ্জিনের শক্তি বা প্রযুক্তির তালিকা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আরাম, দৃশ্যমানতা, আসনের ব্যবহারযোগ্যতা, পর্যাপ্ত জায়গা এবং দীর্ঘ যাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্যও বড় বিষয়। তিন সারির আসন থাকায় Sorento এমন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পারে, যাঁরা মাঝারি আকারের SUV থেকে বড় গাড়িতে যেতে চাইছেন কিন্তু সরাসরি বিলাসবহুল গাড়ির ব্র্যান্ডে যেতে চান না।
কম বিক্রি হলেও Kia-র লাভ হতে পারে
শিল্পমহলের ধারণা, Kia শুরুতেই Sorento-কে বিপুল সংখ্যায় বিক্রি করার লক্ষ্য নাও রাখতে পারে। আসলে সেটিই বুদ্ধিমান কৌশল হতে পারে। ৪০ লাখ টাকার বেশি দামের SUV বাজার এখনও মূলধারার সেগমেন্টের তুলনায় ছোট। তাই Sorento-কে বেশি বিক্রির গাড়ির পরিবর্তে ব্র্যান্ড-বিল্ডিং মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে Kia। একটি শক্তিশালী ফ্ল্যাগশিপ গোটা ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তিকে উন্নত করতে পারে। কোনও ক্রেতা যখন Sonet বা Seltos কিনছেন, তখন তিনি এমন একটি ব্র্যান্ডের অংশ হচ্ছেন যার পোর্টফোলিওতে EV6-এর পাশাপাশি Sorento-র মতো বড় এবং প্রিমিয়াম SUV-ও রয়েছে। এই ব্র্যান্ড ভ্যালু শুধু বিক্রির সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
Sorento এমন একটি বাজারে প্রবেশ করছে যেখানে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন। Toyota Fortuner এখনও ভারতের অন্যতম শক্তিশালী SUV ব্র্যান্ড। Skoda Kodiaq ইউরোপীয় প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত। অন্যদিকে Jeep Meridian-এর রয়েছে আলাদা SUV চরিত্র। এর পাশাপাশি ৪০-৪৫ লাখ টাকা খরচ করতে ইচ্ছুক ক্রেতারা এখন জার্মান বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলির এন্ট্রি-লেভেল SUV-ও বিবেচনা করতে পারেন। তাই Sorento-র ক্ষেত্রে দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি Kia উচ্চ মাত্রায় স্থানীয় উৎপাদন করে প্রতিযোগিতামূলক দাম রাখতে পারে, তাহলে গাড়িটি দ্রুত আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দাম যদি অতিরিক্ত বেড়ে বিলাসবহুল SUV-র এলাকায় ঢুকে যায়, তাহলে সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা অনেকটাই কমে যাবে।
কেন এই লঞ্চ শুধু আরেকটি SUV লঞ্চ নয়?
Sorento-কে শুধুমাত্র নতুন একটি তিন সারির SUV হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি ভারতে Kia-র জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কারণ এটি সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাইব্রিড উদ্যোগ হতে চলেছে। একইসঙ্গে Kia আরও প্রিমিয়াম সেগমেন্টে যেতে চাইছে, সেটিও স্পষ্ট হবে এই গাড়ির মাধ্যমে।
এতদিন ভারতে Kia-র সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল আকর্ষণীয় ডিজাইন, ফিচার এবং প্রতিযোগিতামূলক দাম। Sorento পরীক্ষা করবে, ক্রেতারা কি Kia-কে আরও প্রিমিয়াম এবং পরিণত ব্র্যান্ড হিসেবেও গ্রহণ করবেন। প্রযুক্তি, আরাম, দক্ষতা এবং দীর্ঘ দূরত্বের ব্যবহারের মতো বিষয়গুলিতে Kia কতটা ভালো প্যাকেজ দিতে পারে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
Sorento কি বড় বিক্রির গাড়ি হবে?
সম্ভবত Kia-র কাছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নয়। Sorento যদি বিপুল সংখ্যায় বিক্রি না-ও হয়, তবু এটি Kia-র ভারতে ব্র্যান্ড ইমেজ শক্তিশালী করতে পারে। উত্তর আমেরিকায় Sorento Hybrid চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নজরে আসে, সেটি কোনও একটি নির্দিষ্ট ফিচার নয়। বরং পুরো প্যাকেজটির সামঞ্জস্য।
এটি পরিবারের জন্য তৈরি, দীর্ঘ যাত্রার কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা এবং এমন একটি হাইব্রিড পাওয়ারট্রেন ব্যবহার করে, যা ভারতের মতো বাজারে ক্রমশ আরও যুক্তিযুক্ত হয়ে উঠছে। Kia যদি স্থানীয় উৎপাদন, দাম এবং পজিশনিং ঠিকভাবে করতে পারে, তাহলে Sorento শুধু আরেকটি তিন সারির SUV থাকবে না। এটি এমন একটি গাড়ি হয়ে উঠতে পারে, যা ভারতীয় ক্রেতাদের কাছে ডিজেল এবং সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক গাড়ির মাঝখানে হাইব্রিড প্রযুক্তিকে একটি বাস্তবসম্মত মধ্যপন্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। আর ভারতের দ্রুত বদলে যাওয়া গাড়ির বাজারে সেটিই হয়তো Kia-র জন্য Sorento-র সবচেয়ে বড় গুরুত্ব।
