নয়াদিল্লি: ভারতীয় ফুটবলে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অনেকেরই জানা! কিন্তু প্রকাশ্যে তেমন আলোচনা হয়নি৷ এবার সেই জায়গাতেই কড়া পদক্ষেপ করল অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন বা AIFF। ইন্ডিয়ান সুপার লিগ বা আইএসএলের ক্লাবগুলিকে এখন থেকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে হওয়া মূল চুক্তির পাশাপাশি সমস্ত অতিরিক্ত চুক্তি, সাইড লেটার এবং আর্থিক সুবিধা সংক্রান্ত নথিও জমা দিতে হবে। এর ফলে খেলোয়াড়দের জন্য ক্লাবগুলি বাস্তবে কত টাকা খরচ করছে, তা খতিয়ে দেখার সুযোগ আরও বাড়বে।
আইএসএলে বর্তমানে খেলোয়াড়দের জন্য ক্লাবগুলির বেতনসীমা রয়েছে ১৬.৫ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষস্তরের বেশিরভাগ ক্লাবই কার্যত এই সীমার অনেক বেশি অর্থ খেলোয়াড়দের পিছনে খরচ করে। মূল চুক্তির বাইরে বোনাস লেটার, ইমেজ রাইটস চুক্তি এবং আরও বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার রাস্তা তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্লাবের মূল মালিকানাধীন সংস্থায় চাকরির ব্যবস্থাও করা হয় বলে জানা যায়।
এতদিন এই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা থাকলেও স্যালারি ক্যাপ লঙ্ঘনের অভিযোগে কোনও ক্লাবকে বড় শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। অথচ লিগের নিয়মে বেতনসীমা ভাঙলে জরিমানা এবং পয়েন্ট কেটে নেওয়ার মতো শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়ম ছিল, কিন্তু তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে ক্লাবগুলির মধ্যেও নিয়ম ভাঙার ভয় ছিল না।
এবার সেই পরিস্থিতিতে বদল আনতে চাইছে এআইএফএ। ফেডারেশন জানিয়েছে, খেলোয়াড়ের মূল চাকরির চুক্তির সঙ্গে থাকা সমস্ত সাইড লেটার এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র সেন্ট্রালাইজড রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম বা সিআরএসে আপলোড করতে হবে। চলতি ট্রান্সফার উইন্ডোতে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত যে সমস্ত খেলোয়াড় সংক্রান্ত লেনদেন নথিভুক্ত হবে, সেগুলির ক্ষেত্রেই এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রবিবার সমস্ত রাজ্য ফুটবল সংস্থাকে পাঠানো চিঠিতে এআইএফএর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল এম সত্যনারায়ণ জানিয়েছেন, কোনও ক্লাব যদি সম্পূর্ণ চুক্তিপত্র বা সাইড লেটার জমা না দেয়, কোনও তথ্য গোপন করে কিংবা কোনও নথি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেয়, তা হলে সেটিকে এআইএফএর নিয়ম ও প্রক্রিয়াগত নির্দেশের লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে। সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্লাবের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এআইএফএর এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে সাহিল তাভোরা এবং জিন্দাল ফুটবল প্রাইভেট লিমিটেডের মধ্যে হওয়া একটি মামলা। জিন্দাল ফুটবল প্রাইভেট লিমিটেড হায়দরাবাদ এফসির দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্লাবটির নাম পরিবর্তন করে স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লি রাখা হয়।
মামলাটি খতিয়ে দেখতে গিয়ে প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটি দেখতে পায়, তাভোরার এফসি গোয়ার সঙ্গে হওয়া এমপ্লয়মেন্ট এগ্রিমেন্ট সিআরএসে জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ের একটি ইমেজ রাইটস চুক্তি সেখানে ছিল না। ওই চুক্তির মূল্য ছিল দুই বছরের জন্য ৬৫ লক্ষ টাকা।
হায়দরাবাদ এফসির কাছ থেকে নিজের পাওনা আদায়ের দাবির সময়ও তাভোরা আলাদা ওই ইমেজ রাইটস চুক্তির কথা উল্লেখ করেননি। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, এই চুক্তির অধীনে পাওয়া অর্থকে পাওনা নির্ধারণের সময় বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ সেই অর্থকে নিয়মে ব্যবহৃত ‘রেমুনারেশন’ বা পারিশ্রমিকের সংজ্ঞার মধ্যে ফেলা যায় না।
তবে প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটি সেই যুক্তি মানেনি। গত সপ্তাহে দেওয়া সিদ্ধান্তে কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি রবীন্দ্র সিং জানান, হায়দরাবাদ এফসি এবং খেলোয়াড়ের মধ্যে হওয়া সাইড লেটার এবং প্লেয়ার বোনাস চুক্তিগুলিকেও খেলোয়াড়ের মোট চুক্তিভিত্তিক পারিশ্রমিকের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তাই একটি সুবিধার ক্ষেত্রে চুক্তিকে মেনে নিয়ে অন্য একটি সুবিধাকে হিসাবের বাইরে রাখার দাবি করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটি তাভোরার দাবি খারিজ করে দেয়।
লিগের নিয়ম অনুযায়ী, স্যালারি ক্যাপ হল খেলোয়াড়দের সই করাতে একটি ক্লাব সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করতে পারবে তার সীমা। এর মধ্যে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বোনাস, এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারীর ফি এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে করা পৃথক আর্থিক ব্যবস্থাও ধরা হয়। তবে দলগত বোনাস এর মধ্যে পড়ে না।
আইএসএলের নিয়মে বেতনসীমা রাখার উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনও ক্লাব যাতে আর্থিক শক্তির জোরে অন্যদের তুলনায় অতিরিক্ত সুবিধা না পায়, সেটিই এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
এআইএফএর নতুন নির্দেশ কার্যকর হলে এখন থেকে খেলোয়াড়দের মূল চুক্তির পাশাপাশি তাঁদের পাওয়া অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার নথিও ফেডারেশনের নজরে থাকবে। ফলে ক্লাবগুলি বেতনসীমা মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি বাড়বে। ভারতীয় ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা ‘গোপন চুক্তি’ বা অতিরিক্ত আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়টিও এবার আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসতে পারে।
