বেঙ্গালুরু: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন ব্যবসার ধারণাকে কার্যকর অ্যাপে পরিণত করা এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে। কিন্তু সেই স্টার্টআপকে (AI Startup) বাস্তবে বড় করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে নতুন সমস্যা। অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা অনেক তরুণ উদ্যোগপতির জন্যই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের সম্মেলনে এআই-ই ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। তবে আলোচনার কেন্দ্র ছিল না কীভাবে এআই ব্যবহার করে ব্যবসাকে দ্রুত বড় করা যায়। বরং প্রশ্ন উঠেছে, এআইয়ের সাহায্যে যে স্টার্টআপগুলি তৈরি হচ্ছে, সেগুলিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার মতো দক্ষতা এবং পরিকল্পনা কতটা রয়েছে।
Also Read | মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
সম্মেলনে উপস্থিত বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠাতা জানান, এআই ব্যবহার করে তাঁরা নিজেদের ব্যবসার ধারণাকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক পর্যায়ের পণ্যে পরিণত করতে পেরেছেন। কিন্তু সেই প্রাথমিক সাফল্যের পর কীভাবে পণ্যটিকে উন্নত করা হবে, গ্রাহক তৈরি করা হবে এবং ব্যবসাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা হবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিষয়টিকে অনেকটা এমন একজন চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, যিনি চাকরির আবেদনপত্র তৈরি করতে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে সহজেই সাক্ষাৎকারের পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন, কিন্তু সাক্ষাৎকারে গিয়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে সমস্যায় পড়লেন। এআই-নির্ভর স্টার্টআপগুলির ক্ষেত্রেও প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পর বাস্তব ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
Also Read | DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন
বেঙ্গালুরুর ওই অনুষ্ঠানে এমনই একটি স্টার্টআপের উদাহরণ সামনে আসে। রাজস্থানের এক মার্কেটিং স্নাতক এআই ব্যবহার করে একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন। অ্যাপটি কোনও কর্মীর বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা বা সেলস টার্গেট অনুসরণ করে এবং সেই কর্মীর জন্য আরও ভালো চাকরির সুযোগের সুপারিশ করে। অর্থাৎ কোনও কর্মী অ্যাপে নিজের তথ্য নথিভুক্ত করলে তাকে নিজে থেকে চাকরি খোঁজার প্রয়োজন কমাতে পারে এই পরিষেবা।
এআইয়ের সাহায্যে অ্যাপটির প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব হলেও, এর পরের ধাপই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করা এবং সেটিকে এমন একটি নির্ভরযোগ্য পণ্যে পরিণত করা, যার জন্য মানুষ নিয়মিত অর্থ দিতে আগ্রহী হবে, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
এআই-ভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরির খরচ এবং সময় কমিয়ে দেওয়ায় স্টার্টআপ তৈরির প্রবেশের বাধা অনেকটাই কমেছে। আগে যে কাজের জন্য একাধিক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার এবং দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারত, এখন বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে একজন বা ছোট একটি দল দ্রুত প্রাথমিক পণ্য তৈরি করতে পারছে।
Also Read |অক্টোবরেই ভারতে আসছে Google Fitbit Air, স্ক্রিনহীন ওয়্যারেবলের দাম কত?
এর ফলে নতুন নতুন ব্যবসার ধারণা দ্রুত বাজারে আসছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। একই ধরনের এআই টুল ব্যবহার করে বহু সংস্থা প্রায় একই ধরনের পরিষেবা তৈরি করতে পারছে। ফলে শুধু এআই ব্যবহার করে একটি অ্যাপ বানানোই আর প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে যথেষ্ট নয়।
স্টার্টআপের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নিজস্ব ব্যবসায়িক মডেল, নির্দিষ্ট গ্রাহক সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, বাজার সম্পর্কে গভীর ধারণা এবং ব্যবহারকারীদের দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার কৌশল। এআই প্রোটোটাইপ তৈরির গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু গ্রাহক কেন সেই পণ্য ব্যবহার করবেন এবং কেন তার জন্য অর্থ দেবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এআই একা দিতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্ভর নতুন উদ্যোগগুলির ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠাতার নিজস্ব দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ব্যবসার মূল ধারণা যদি শুধুমাত্র একটি এআই টুলের সাহায্যে তৈরি হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরাও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই ধরনের পণ্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে সেই স্টার্টআপের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা খুব সহজেই কমে যেতে পারে।
তাই এআই দিয়ে স্টার্টআপ তৈরি করার যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর পণ্য তৈরি করা নয়। বরং সেই পণ্যকে বাস্তব ব্যবসায় পরিণত করার মতো বাজার জ্ঞান, গ্রাহক বোঝার ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠাতার রয়েছে কি না, সেটিই হয়ে উঠছে সাফল্যের মূল পরীক্ষা।
