কলকাতা: যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রবিবার সন্ধ্যায় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, হতে চলেছে কলকাতা ফুটবলের আরও একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ডুরান্ড কাপের (Durand Cup) ফাইনালে মুখোমুখি মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল। একই টুর্নামেন্টে এর আগে ডার্বি হলেও ফাইনালের চাপ, আবেগ এবং প্রত্যাশা সম্পূর্ণ আলাদা।
এশিয়ার প্রাচীনতম ফুটবল টুর্নামেন্টের ট্রফির জন্য লড়াই করবে কলকাতার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ম্যাচের আগে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কোন দল কোথায় এগিয়ে? আর কোন জায়গাগুলি ফাইনালে সমস্যায় ফেলতে পারে দুই দলকে?
Read More: East Bengal: চলতি সপ্তাহেই শহরে এফিয়ং? নজর সমর্থকদের
আক্রমণভাগে এগিয়ে মোহনবাগান
আক্রমণভাগের গভীরতা বিচার করলে মোহনবাগান স্পষ্টতই এগিয়ে। সবুজ-মেরুনের হাতে রয়েছে একাধিক ম্যাচ উইনার। ম্যাকলারেন ও মিগুয়েলের মতো বিদেশিদের পাশাপাশি মনবীর ও সাহালের মতো ভারতীয় ফুটবলাররাও ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। সেমিফাইনালে বিদেশি ফুটবলারদের কিছুটা সময় মাঠে নামিয়ে কোচ তাঁদের ম্যাচ ফিটনেস ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে। ইস্টবেঙ্গলের তুলনায় মোহনবাগানের আক্রমণভাগে বিকল্পও বেশি। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী বেঞ্চ থেকে এসে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার মতো ফুটবলার সবুজ-মেরুনের হাতে রয়েছে।
Read More: | সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে ফের নজরে বাংলা! কালিকাপুরের মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার ৪০লক্ষ নগদ-১৮০ গ্রামের সোনার মুদ্রা
ইস্টবেঙ্গলের শক্তি রক্ষণ
মোহনবাগানের আক্রমণ যেখানে বড় অস্ত্র, সেখানে ইস্টবেঙ্গলের প্রধান ভরসা রক্ষণ। হাবাসের দল সাধারণত খুব বেশি জায়গা ছেড়ে খেলতে চায় না। ডিফেন্সিভ ব্লক তৈরি করে প্রতিপক্ষকে আটকে রেখে সুযোগ বুঝে আক্রমণে যাওয়াই হতে পারে লাল-হলুদের পরিকল্পনা। আনোয়ার আলি ও লালচুংনুঙ্গাদের পাশাপাশি সন্দীপ মান্ডি, জয় গুপ্তদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। তাঁদের সামান্য ভুলও ফাইনালে বড় ক্ষতি করতে পারে।
গোলপোস্টে দুই দলের সমানে-সমানে লড়াই
ফাইনালের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে দুই গোলরক্ষকের লড়াই। মোহনবাগানের বিশাল কাইথ দীর্ঘদিন ধরে দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সদস্য। বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলের প্রভসুখন সিং গিলও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তাঁর সামনে যদি রক্ষণ সঠিকভাবে কাজ করে, তা হলে মোহনবাগানের আক্রমণকে আটকে রাখার মতো দক্ষতা তাঁর রয়েছে। ফলে গোলরক্ষকের জায়গায় দুই দলকেই প্রায় সমান জায়গায় রাখা যায়।
ইস্টবেঙ্গলের বড় সমস্যা গোল করা
রক্ষণ যতই শক্তিশালী হোক, ফাইনাল জিততে গোল চাই। আর এখানেই ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। লাল-হলুদের আক্রমণভাগ এখনও সেই ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি, যা একটি ফাইনালে প্রয়োজন। র্যামিরেজ নিজের সেরা ছন্দে নেই। ইকোনোমিডিসও প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফলে প্রতিপক্ষের বক্সে সুযোগ তৈরি হলে কে সেটাকে গোলে পরিণত করবেন, সেটাই হাবাসের বড় চিন্তা। পিভি বিষ্ণুর চোট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তাঁর গতি এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা ইস্টবেঙ্গলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মোহনবাগানের চিন্তা ক্লান্তি
সবুজ-মেরুনের সমস্যা আবার সম্পূর্ণ উল্টো। তাঁদের স্কোয়াডে গুণমানের অভাব নেই, কিন্তু সময়ের অভাব রয়েছে।মাত্র ছ’দিনে তিনটি ম্যাচ খেলা যে কোনও দলের জন্যই কঠিন। তার মধ্যে পাহাড়ে ম্যাচ খেলা এবং যাতায়াতের ধকল রয়েছে।ফাইনালের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে ম্যাচের শেষ দিকে মোহনবাগানের ফুটবলারদের গতি কমে যেতে পারে। আর সেই সময়ই ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কোচের লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ
ফাইনালের ফল নির্ধারণে দুই কোচের কৌশল বড় ভূমিকা নিতে পারে। মোহনবাগানের কোচের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলের আক্রমণাত্মক শক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ক্লান্ত ফুটবলারদের সামলে রাখা। হাবাসের পরিকল্পনা হতে পারে শুরু থেকেই ম্যাচকে নিয়ন্ত্রিত রাখা। মোহনবাগানকে বেশি জায়গা না দিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোই হতে পারে তাঁর কৌশল। ফাইনালের মতো ম্যাচে প্রথম গোল তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মানসিক চাপ কার বেশি?
ডার্বিতে মানসিক চাপ সবসময়ই থাকে। কিন্তু এই ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রে সেই চাপ আরও বেশি। লাল-হলুদ সমর্থকরা দীর্ঘ ২২ বছর ধরে ডুরান্ড কাপ জয়ের অপেক্ষায়। সম্প্রতি আইএসএল জিতে দীর্ঘ ট্রফি-খরা কাটালেও ডুরান্ডের ট্রফি এখনও অধরা। অন্যদিকে মোহনবাগানও জানে, ডার্বিতে হারলে শুধু একটি ট্রফিই হাতছাড়া হবে না, সমর্থকদের কাছে সেই হার দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
ম্যাচের সম্ভাব্য চিত্র
ম্যাচের শুরুতে দুই দলই সতর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে ইস্টবেঙ্গল প্রথম থেকেই বেশি ঝুঁকি নেবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। মোহনবাগান বলের দখল রেখে আক্রমণ তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে। ইস্টবেঙ্গল অপেক্ষা করতে পারে কাউন্টার অ্যাটাকের সুযোগের জন্য। প্রথম গোল হয়ে গেলে ম্যাচের চেহারা দ্রুত বদলে যেতে পারে। মোহনবাগান এগিয়ে গেলে ইস্টবেঙ্গলকে আক্রমণে উঠতেই হবে। আবার ইস্টবেঙ্গল প্রথম গোল করলে হাবাসের দল আরও গভীরে গিয়ে রক্ষণ সামলানোর চেষ্টা করতে পারে। দুই দলের শক্তি ও দুর্বলতা একেবারেই আলাদা। মোহনবাগানের শক্তি আক্রমণ ও স্কোয়াডের গভীরতা, ইস্টবেঙ্গলের শক্তি রক্ষণ ও কোচের অভিজ্ঞতা। সবুজ-মেরুনের সমস্যা ক্লান্তি এবং রক্ষণে কিছুটা জড়তা। লাল-হলুদের সমস্যা ধারাবাহিক গোলদাতার অভাব।
তাই কাগজে মোহনবাগান এগিয়ে থাকলেও ডার্বির ফাইনালে কোনও দলকেই ফেবারিট বলে ধরে নেওয়া কঠিন। যুবভারতীর গ্যালারিতে হাজার হাজার সমর্থকের সামনে শেষ পর্যন্ত যে দল চাপ সামলাতে পারবে, তার হাতেই উঠতে পারে ডুরান্ড কাপের ট্রফি।
