কলকাতা: ডুরান্ড কাপের (Durand Cup) শুরুটা হয়েছিল কলকাতা ডার্বি দিয়ে। আর চার সপ্তাহ পর সেই ডার্বিতেই নির্ধারিত হবে ১৩৫তম ইন্ডিয়ান অয়েল ডুরান্ড কাপের চ্যাম্পিয়ন। আজ, রবিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মুখোমুখি হবে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং ইস্টবেঙ্গল এফসি। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল মোহনবাগান। এবার সেই হারের বদলা নেওয়ার পাশাপাশি ট্রফি জয়ের লক্ষ্য থাকবে লাল-হলুদ শিবিরের। মোহনবাগান এখনও পর্যন্ত টুর্নামেন্টে অপরাজিত। অন্যদিকে প্রথম ম্যাচে হারের পর আর কোনও ম্যাচে হারেনি ইস্টবেঙ্গল।
চার সপ্তাহ পর ফের সেই ডার্বি
২৫ জুলাই গ্রুপ এ-র ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই কলকাতা প্রধান। সেই ম্যাচে সাহাল আবদুল সামাদের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল মোহনবাগান। এরপর গ্রুপ পর্বে নিজেদের আক্রমণাত্মক শক্তির পরিচয় দেয় সবুজ-মেরুন। সাউথ ইউনাইটেড এফসির বিরুদ্ধে ৮-০ এবং সিআইএসএফ প্রোটেক্টর্সের বিরুদ্ধে ৬-০ গোলে জিতে গ্রুপের শীর্ষে শেষ করে তারা। ইস্টবেঙ্গলও প্রথম ম্যাচের হারের পর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। সিআইএসএফ প্রোটেক্টর্সকে ৮-০ এবং সাউথ ইউনাইটেড এফসিকে ৫-০ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। প্রথম ম্যাচের পর থেকে আর হারেনি ইস্টবেঙ্গল।
নকআউটে দুই দলকেই কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে
গ্রুপ পর্বের বড় ব্যবধানের জয়ের পর নকআউট পর্বে দুই দলই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইন্ডিয়ান আর্মি এফটিকে ১-০ গোলে হারায় ইস্টবেঙ্গল। ৩৮ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন পি ভি বিষ্ণু। সেমিফাইনালে স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লির বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র হয়। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে জয় পেয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে ইস্টবেঙ্গল। মোহনবাগানকেও ফাইনালে উঠতে পেনাল্টির পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে জামশেদপুর এফসির সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর দীর্ঘ পেনাল্টি শুটআউটে ৯-৮ ব্যবধানে জেতে তারা।
সেমিফাইনালে গতবারের চ্যাম্পিয়ন নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসির বিরুদ্ধে ম্যাচও গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। বৃষ্টির কারণে ম্যাচের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। পেনাল্টি শুটআউটে রবিন যাদব এবং পার্থিব গগৈয়ের শট রুখে দিয়ে মোহনবাগানকে ৪-৩ ব্যবধানে জয় এনে দেন গোলরক্ষক বিশাল কাইথ।
দুই দলের রক্ষণই বড় শক্তি
ফাইনালের আগে পরিসংখ্যানেও দুই দলের রক্ষণভাগের শক্তি স্পষ্ট। ছয়টি ম্যাচে মোহনবাগান করেছে ১৬টি গোল এবং খেয়েছে মাত্র একটি গোল। অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গল করেছে ১৪টি গোল এবং তারাও মাত্র একটি গোল হজম করেছে। সেই একমাত্র গোলটিও এসেছিল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ডার্বিতে। অর্থাৎ দুই দলেরই রক্ষণাত্মক রেকর্ড প্রায় একই রকম। তাই ফাইনালে একটি ছোট ভুলও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
ডুরান্ড কাপ ফাইনালে ১৩তম সাক্ষাৎ
ডুরান্ড কাপের ফাইনালে রবিবার ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান ১৩তম বার মুখোমুখি হবে। এখনও পর্যন্ত দুই দলই পাঁচটি করে ফাইনাল জিতেছে। আরও দুটি ফাইনাল দুই ক্লাবের যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছে। দুই দলের শেষ ফাইনাল সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০২৩ সালে। সেই ম্যাচে ১০ জনের ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল মোহনবাগান। ৭১ মিনিটে গোল করেছিলেন দিমিত্রিয়স পেত্রাতোস।
ইতিহাস বদলের সুযোগ দুই দলের সামনে
মোহনবাগান ইতিমধ্যেই ১৭ বার ডুরান্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। রবিবার জিতলে তাদের শিরোপার সংখ্যা বেড়ে হবে ১৮। ইস্টবেঙ্গলের ঝুলিতে রয়েছে ১৬টি ডুরান্ড কাপ ট্রফি। তাই রবিবার ট্রফি জিতলে লাল-হলুদও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ১৭টি শিরোপায় সমতা ফেরাতে পারবে। ফলে ট্রফির পাশাপাশি ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়ার লড়াইও থাকবে এই ডার্বিতে।
সাহাল বনাম বাসিম, নজরে একাধিক তারকা
মোহনবাগানের অন্যতম বড় ভরসা সাহাল আবদুল সামাদ। উদ্বোধনী ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল করার পর সিআইএসএফ প্রোটেক্টর্সের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকও করেছেন তিনি। ম্যানভীর সিংও তিনটি গোল করেছেন। গোলের নিচে মোহনবাগানের বড় ভরসা বিশাল কাইথ। পেনাল্টি শুটআউটে ইতিমধ্যেই দু’বার দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন তিনি।
ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন অধিনায়ক মহম্মদ বাসিম রশিদ। সেমিফাইনালে স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লির বিরুদ্ধে তিনি দু’বার ক্রসবারে বল মেরেছিলেন। পরে শুটআউটে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টিও গোল করেন। গোলরক্ষক প্রভসুখন সিং গিলও ইস্টবেঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। স্বাভাবিক সময় এবং পেনাল্টি শুটআউট, দুই ক্ষেত্রেই সেমিফাইনালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন।
মোহনবাগানের আক্রমণে আরও বিকল্প রয়েছে। ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার মিগেল ফিগেইরা এবং ভারতীয় উইঙ্গার লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে নকআউট পর্বের জন্য দলে যোগ দেওয়ার পর সেমিফাইনালে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন।
কৌশলের লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ
ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণাত্মক সংগঠন এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের বিপরীতে মোহনবাগানের বল দখলে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা দেখা যেতে পারে। ইস্টবেঙ্গলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস ফাইনালের আগে খেলোয়াড়দের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, কলকাতা ডার্বি ভারতের অন্যতম বিশেষ ম্যাচ হলেও খেলোয়াড়দের এটিকে অন্য ম্যাচের মতোই সামলাতে হবে। এমন বড় ম্যাচে বাড়তি অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয় না, বরং পুরো ৯০ মিনিট আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। মোহনবাগানের কোচ ডিলমপেরিসও মানসিক প্রস্তুতিকে বড় বিষয় হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, এই ধরনের ম্যাচে মানসিক লড়াই গুরুত্বপূর্ণ এবং জয়ের জন্য আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
চার সপ্তাহের ব্যবধানে বদলে যাবে গল্প?
টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে মোহনবাগান ১-০ গোলে জিতেছিল। কিন্তু তারপর থেকে ইস্টবেঙ্গল নিজেদের অনেকটাই বদলে ফেলেছে। লাল-হলুদ শিবির প্রথম ম্যাচের পর আর হারেনি। অন্যদিকে মোহনবাগানও নকআউট পর্বে কঠিন পরিস্থিতি সামলে ফাইনালে এসেছে। দুই দলের রক্ষণাত্মক রেকর্ড প্রায় সমান এবং টুর্নামেন্টে ইস্টবেঙ্গল মাত্র একটি ম্যাচে হেরেছে। ফলে চার সপ্তাহ আগের ডার্বির ফল দিয়ে রবিবারের ফাইনালের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কঠিন।
টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল কলকাতা ডার্বি দিয়ে। এবার সেই একই লড়াইতেই ঠিক হবে ডুরান্ড কাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন। ১৭তম নাকি ১৮তম? ট্রফি উঠবে ইস্টবেঙ্গলের হাতে, নাকি মোহনবাগান আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে ইতিহাসে, তার উত্তর মিলবে রবিবার যুবভারতীতে।
