নয়াদিল্লি: দেশে বৈধ থার্ড-পার্টি মোটর বিমা (Motor Insurance) ছাড়া রাস্তায় চলা গাড়ির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার শীর্ষ আদালত কেন্দ্র সরকারকে এমন একটি পাইলট প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে বৈধ থার্ড-পার্টি বিমা না থাকলে পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি দেওয়া হবে না। আদালতের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে বিমাহীন গাড়ি সহজে চিহ্নিত করা যাবে এবং গাড়ির মালিকদের বাধ্যতামূলক বিমা করাতে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং প্রশান্ত কুমার মিশ্র-র বেঞ্চ জানিয়েছে, দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ যানবাহনের বৈধ বিমা নেই। আদালত ২০২৪-২৫ সালের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ফিন্যান্সের রিপোর্ট উল্লেখ করে জানিয়েছে, বর্তমানে ৩০.৪৮ কোটি নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে ১৬.৫৪ কোটি গাড়ি বিমাহীন। এই পরিস্থিতিকে আদালত অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে।
সুপ্রিম কোর্ট ইনস্যুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া (IRDAI) এবং সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক (MoRTH)-কে যৌথভাবে এই পাইলট প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনও গাড়ির বৈধ থার্ড-পার্টি বিমা না থাকলে সেই গাড়িকে পেট্রোল বা ডিজেল দেওয়া হবে না, যতক্ষণ না মালিক প্রয়োজনীয় বিমা করাচ্ছেন।
আদালত বলেছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে Automatic Number Plate Recognition (ANPR) ক্যামেরা ব্যবহার করা যেতে পারে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়ির নম্বরপ্লেট স্ক্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাবে গাড়িটির বৈধ বিমা রয়েছে কি না। আদালত জানিয়েছে, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক নীতিগতভাবে এই প্রস্তাবে আপত্তি জানায়নি।
Also Read | চিন,পাক-বাংলাদেশ সীমান্তে রেল খাতে ৪৫০০০ কোটি বরাদ্দ করার পরিকল্পনা মোদী সরকারের
শুধু জ্বালানি নিষেধাজ্ঞাই নয়, নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক থার্ড-পার্টি বিমার মেয়াদ বাড়ানোরও নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৮ সালে আদালত নতুন চারচাকা গাড়ির জন্য ৩ বছরের এবং নতুন দুইচাকার জন্য ৫ বছরের থার্ড-পার্টি বিমা বাধ্যতামূলক করেছিল। এবার সেই মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে ৪ বছর এবং নতুন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ৬ বছর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা অবিলম্বে জারি করতে IRDAI-কে বলা হয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, বাধ্যতামূলক বিমার মূল উদ্দেশ্য শুধু আইন মানা নয়, বরং সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। বিমাহীন গাড়ির কারণে বহু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার মানুষকে দীর্ঘদিন আইনি লড়াই করতে হয়, বিশেষ করে মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের মতো গুরুতর ঘটনায়।
Also Read | বিশ্বে প্রথম বিদ্যুৎ চালিত ডবল স্ট্যাক ট্রেন চালিয়ে ইতিহাস ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ভারতের
এছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, ANPR ক্যামেরাকে VAHAN পোর্টাল এবং Insurance Information Bureau-এর ডেটাবেসের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যাতে বিমাহীন গাড়ির বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-চালান ইস্যু করা যায়। রাজ্য পুলিশের হাতে এমন হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস বা মোবাইল অ্যাপ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে রাস্তায় দাঁড়িয়েই কোনও গাড়ির বিমার বর্তমান অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হবে।
আদালত আরও বলেছে, IRDAI-কে এমন নীতিমালা আনতে হবে যাতে গাড়ির মালিকরা ন্যূনতম বাধ্যতামূলক বিমার পাশাপাশি পার্সোনাল অ্যাক্সিডেন্ট কভার, ওন-ড্যামেজ কভার এবং বিভিন্ন অ্যাড-অন কভার বেছে নেওয়ার সুযোগ পান।
একই সঙ্গে জাতীয় সড়কে যানজট কমানোর লক্ষ্যে টোল প্লাজায় গাড়ি থামিয়ে টোল আদায়ের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহন শনাক্ত করে টোল সংগ্রহের পাইলট প্রকল্প চালুর নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
একটি মোটর দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এই নির্দেশগুলি জারি করে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, বর্তমান আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাধ্যতামূলক থার্ড-পার্টি বিমার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে এখনও ক্ষতিপূরণ পেতে “দরজায় দরজায় ঘুরতে” হচ্ছে, যা দ্রুত বদলানো জরুরি।
