কলকাতা: ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন উদ্যোক্তা বালাজি শ্রীনিবাসন (Balaji Srinivasan) প্রযুক্তি জগতের পরিচিত মুখ। স্টার্টআপের মতো একটি নতুন দেশ গড়ার অভিনব ধারণা নিয়ে তিনি গত দুই বছর ধরে কাজ করছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই মালয়েশিয়ায় তৈরি হয়েছিল ‘Network School’ নামে একটি আবাসিক ক্যাম্পাস। তবে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই প্রকল্পে আপাতত ইতি টেনেছে মালয়েশিয়া। স্থানীয় প্রশাসন লাইসেন্স সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাসের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের কাছে দক্ষিণ মালয়েশিয়ার ফরেস্ট সিটি (Forest City) এলাকায় এই ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়েছিল। এটি ছিল এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে একই চিন্তাধারার মানুষ একত্রিত হয়ে ভবিষ্যতে একটি নতুন ধরনের সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনের ধারণা নিয়ে কাজ করছিলেন।
কে এই বালাজি শ্রীনিবাসন?
৪৬ বছর বয়সি বালাজি শ্রীনিবাসনের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর বাবা-মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন। পরে একটি জেনেটিক স্ক্রিনিং সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিখ্যাত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থা Andreessen Horowitz-এ কাজ করেন। এছাড়া তিনি কিছু সময়ের জন্য ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ Coinbase-এর চিফ টেকনোলজি অফিসার (CTO) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে সিঙ্গাপুরের নাগরিক বলে পরিচয় দেন।
কী ছিল ‘Network State’-এর ধারণা?
২০২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বই The Network State-এ বালাজি শ্রীনিবাসন একটি নতুন ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে অনলাইন সম্প্রদায় (Online Community) দিয়ে।
এই মডেলে প্রথমে একই আদর্শের মানুষ ইন্টারনেটে একত্রিত হবে, একে অপরকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করবে, পরে যৌথভাবে জমি কিনবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করবে। তিনি এই প্রক্রিয়াকে সাতটি ধাপে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল Forest City?
এই পরিকল্পনার পরীক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল মালয়েশিয়ার Forest City-কে। চীনের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল প্রকল্প একসময় বিলাসবহুল শহর হিসেবে পরিকল্পনা করা হলেও পরে অধিকাংশ অংশই প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে।
সেখানেই ২০২৪ সালে একটি হোটেলের অংশ ভাড়া নিয়ে Network School চালু করেন বালাজি। প্রতি মাসে ১,৫০০ মার্কিন ডলার ফি-এর বিনিময়ে অংশগ্রহণকারীরা থাকার ব্যবস্থা, খাবার, বিভিন্ন ক্লাস এবং অন্যান্য সুবিধা পেতেন।
প্রথম ব্যাচে ১২৮ জন এবং দ্বিতীয় ব্যাচে ২৫৬ জন অংশগ্রহণের সুযোগ পান। ক্যাম্পাসে জিম, বিশেষ স্বাস্থ্যকর খাবার এবং আধুনিক জীবনযাপনের বিভিন্ন সুবিধাও ছিল।
কেন বন্ধ হল এই প্রকল্প?
স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ক্যাম্পাসটি লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে মানেনি। তবে এর আগে অন্য একটি বিষয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রো-প্যালেস্টাইন গোষ্ঠীর পোস্টে অভিযোগ করা হয়, ক্যাম্পাসে কয়েকজন ইজরায়েলি নাগরিক ছিলেন, যাঁদের মধ্যে একজন নাকি দ্বিতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে প্রবেশ করেছিলেন।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না। তাই ইজরায়েলি নাগরিকদের দেশটিতে প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন।
এই অভিযোগের পর অভিবাসন দফতরের আধিকারিকরা ক্যাম্পাসে গিয়ে পাসপোর্ট পরীক্ষা করেন। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, এখনও পর্যন্ত কোনও অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি এবং তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, বালাজি শ্রীনিবাসন অভিযোগটিকে ভুয়ো (Hoax) বলে দাবি করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে বৈঠকের আবেদন জানান।
এবার গন্তব্য কাজাখস্তান
মালয়েশিয়ায় প্রকল্প বন্ধ হওয়ার নির্দেশ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বালাজি শ্রীনিবাসন একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁকে কাজাখস্তানের এক উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নতুন চুক্তিতে সই করতে দেখা যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজাখস্তান বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর ছাড়, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির মতো বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে। সেই কারণেই তিনি সেখানে নতুন করে Network School গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন।
প্রযুক্তি আর রাষ্ট্রের মাঝখানে প্রশাসনিক বাস্তবতা
বালাজি শ্রীনিবাসনের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, অনলাইনে একই আদর্শের মানুষকে একত্রিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও বাস্তবে কোনও ভূখণ্ডে নতুন ধরনের সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিয়মই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মালয়েশিয়ার প্রকল্প আপাতত থেমে গেলেও, কাজাখস্তানে সেই ধারণাকে নতুনভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা এখন শুরু হতে চলেছে।
