নিরাপত্তা, রাজনীতি ও ভোটব্যাঙ্ক! মোদী শাসনে বাংলার মুসলিম সমাজ

মৌমিতা চক্রবর্তী: ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিম নিরাপত্তা (Muslim security Bengal) নিয়ে বিতর্ক বহুস্তরীয়। কেন্দ্রীয় শাসন বদলের পর থেকে এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র…

modi-rule-bengal-muslim-security-politics-votebank

মৌমিতা চক্রবর্তী: ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিম নিরাপত্তা (Muslim security Bengal) নিয়ে বিতর্ক বহুস্তরীয়। কেন্দ্রীয় শাসন বদলের পর থেকে এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর সরকারের নীতি। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে অতিসংবেদনশীল ও বহুধর্মীয় রাজ্যে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। বাংলার মাটি সংবিধান, প্রশাসন, স্থানীয় রাজনীতি এবং গ্রামীণ স্তরের বাস্তব নিরাপত্তা সবকিছুকে মিলিয়ে বিচার করে। তাই মোদী শাসনে বাংলার মুসলিমরা কতটা নিরাপদ, এটি শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং মাঠঘেঁষা পর্যবেক্ষণে নির্মিত একটি বাস্তব প্রশ্ন।

Advertisements

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ত্রিশ শতাংশ। বিশেষত মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের অঞ্চলে এই জনসংখ্যা যে কোনও নির্বাচনের সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম। ২০১৯ সালের রায়গঞ্জ ও মালদা উত্তর লোকসভা নির্বাচনে মুসলিম ভোটের বিভাজন এবং বিরোধী শিবিরের দুর্বল সমন্বয় বিজেপির অপ্রত্যাশিত সাফল্য এনে দেয়। নির্বাচন-পরবর্তী বিশ্লেষণে প্রবীণ সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম মন্তব্য করেছিলেন যে মুসলিম ভোট সবসময় একদিকে যায় এই ধারণা রাজনৈতিক রোমান্স মাত্র, বাস্তব নয়। তাঁর মতে নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ভোটের দিক নির্ধারণ করে। সেই পর্যবেক্ষণ পরবর্তী নির্বাচনের তথ্যেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

   

আরও পড়ুন: মহিলা সাংবাদিক-নির্যাতন! গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের নিরাপত্তা কোথায়?

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের সুতির, জঙ্গিপুর অথবা ইসলামপুরের মতো এলাকায় মুসলিম ভোটারদের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে। রাজনৈতিক অস্থিরতা অথবা দলীয় সংঘর্ষের সময়ে কেন্দ্রীয় প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন। এর ফলে মুসলিম ভোটের একটি অংশ মোদী সরকারের প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে সম্ভাব্য নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে বিহারের ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচন। ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম-প্রধান অঞ্চল যেমন কিশনগঞ্জ, আরারিয়া ও পুরনিয়া দীর্ঘদিন ধরে আরজেডির ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে দেখা যায় যে এনডিএ সেখানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক রাহমান কাশিফ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে মুসলিম ভোট ধর্মীয় আহ্বানে স্থির থাকে না। স্থানীয় প্রশাসনের দক্ষতা, স্থিতিশীলতা এবং জনকল্যাণ প্রকল্পে নিশ্চিততার ওপর আস্থা তৈরি হলে ভোটের দিক বদলে যায়। এই বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে মুসলিম ভোটের একটি অংশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে গুরুত্ব দিচ্ছে।

Advertisements

আরও পড়ুন: ফাইলের অন্তরালেই রাজনীতি!

মোদী সরকারের কেন্দ্রীয় কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে বাস্তব প্রভাব ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সরেজমিন তথ্য সংগ্রহে দেখা গেছে যে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার এবং ডিজিটাল বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে বহু মুসলিম পরিবার উপকৃত হয়েছে। মালদা, হাওড়া এবং উত্তর দিনাজপুরের গ্রামীণ অঞ্চলে এই সুবিধাগুলি স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বলে প্রশাসনিক পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়।

তবে মুসলিম নিরাপত্তার প্রশ্নে কেবল উন্নয়নমূলক সাফল্যই আলোচ্য বিষয় নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনাও এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষক আতাউর রহমান এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে ফ্রিঞ্জ গোষ্ঠীর আচরণ দিয়ে রাষ্ট্রকে বিচার করলে ভুল হবে। তাঁর মতে রাষ্ট্র প্রশাসন কোনও ঘটনা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে, সেটাই নিরাপত্তার আসল পরিমাপক। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও এই মন্তব্য যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক, কারণ এখানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ অনেক সময় ধর্মীয় সম্পর্কের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করে।

মোদী শাসনের বিস্তার বোঝাতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যাপক নরেশ ফেরোজির পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁর দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে যে মুসলিম ভোটের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলার নিশ্চয়তা, সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এই তিনটি বিষয় সর্বাধিক প্রভাব ফেলে। তাঁর মতে ধর্মীয় মেরুকরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরাপত্তা অনুভূতি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক দৃঢ়তার ওপরই নির্ভর করে।

একই সময়ে প্রবীণ সাংবাদিক দীপঙ্কর মিত্রের মতামত এই বিশ্লেষণকে আরও গভীর করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী বাংলার মুসলিম ভোট কখনও একরেখায় চলে না। তারা হিসেব করে দেখে কোন সরকার আইনের প্রয়োগে সত্যিই কঠোর এবং কোন সরকার রাজনৈতিক সমীকরণে আইনের দড়ি ঢিলা রাখে। নিরাপত্তা অনুভূতি ঠিক সেখানেই তৈরি হয়।

সমস্ত পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য একত্রিত করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মোদী শাসনে বাংলার মুসলিম নিরাপত্তা কোনও একমাত্রিক প্রশ্ন নয়। আইনি কাঠামো, কেন্দ্রীয় প্রশাসনের দৃঢ়তা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং নির্বাচন-পর্যায়ের ভোট আচরণ এই সব উপাদানের জটিল সমন্বয়েই এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করে। বাংলার মতো রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত এবং সামাজিকভাবে বহুবর্ণ রাজ্যে নিরাপত্তার অনুভূতিও স্বভাবতই বহুস্তরীয়।

সারসংক্ষেপে বলা যায় যে মোদী শাসনে মুসলিম নিরাপত্তা কোনও সরল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার সমষ্টি। কিছু ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের দৃঢ় প্রশাসন মুসলিম সমাজের একাংশে আস্থার জন্ম দেয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক সংঘাত সেই আস্থাকে চাপের মুখে ফেলে। ফলে এই প্রশ্নের উত্তর একরূপ নয়। সময়, অঞ্চল, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক আচরণের ওপর নির্ভর করে এর ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হয়।

Advertisements