ভাগ্য নয়, দক্ষতায় জোর: H-1B ভিসায় লটারি তুলে নিল আমেরিকা

দীর্ঘদিনের প্রচলিত লটারির নিয়ম ভেঙে H-1B ওয়ার্ক ভিসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা করল মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর (Department of Homeland Security)। নতুন ব্যবস্থায় আর নিছক…

দীর্ঘদিনের প্রচলিত লটারির নিয়ম ভেঙে H-1B ওয়ার্ক ভিসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা করল মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা দফতর (Department of Homeland Security)। নতুন ব্যবস্থায় আর নিছক ভাগ্যের উপর নির্ভর করে ভিসা মিলবে না। বরং উচ্চ বেতনপ্রাপ্ত ও অধিক দক্ষ বিদেশি পেশাদারদের অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ওয়েটেড সিলেকশন সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।

Advertisements

দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হল H-1B ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অপব্যবহার রোখা। অভিযোগ ছিল, অনেক মার্কিন সংস্থা তুলনামূলক কম মজুরিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য এই ভিসা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে, যার ফলে দেশীয় শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

   

মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন দফতরের (USCIS) মুখপাত্র ম্যাথিউ ট্রাগেসার সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “র‌্যান্ডম লটারি পদ্ধতিটি এমনভাবে কাজে লাগানো হয়েছে, যেখানে কিছু নিয়োগকর্তা আমেরিকান কর্মীদের তুলনায় কম বেতনে বিদেশি শ্রমিক আনতেই আগ্রহী ছিলেন।”

ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অভিবাসন নীতির ধারাবাহিকতা

H-1B নিয়মে এই বদলকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতিরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন, যেখানে প্রতিটি H-1B ভিসার জন্য নিয়োগকর্তাকে বছরে অতিরিক্ত ১ লক্ষ ডলার ফি দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। যদিও এই সিদ্ধান্ত বর্তমানে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে।

Advertisements

এর পাশাপাশি, ধনীদের জন্য নাগরিকত্বের নতুন পথ হিসেবে ১০ লক্ষ ডলারের ‘গোল্ড কার্ড’ ভিসা প্রকল্পও সামনে এনেছে প্রশাসন।

স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নতুন ওয়েটেড সিলেকশন পদ্ধতি এই সব নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ বেতন ও উচ্চ দক্ষতার চাকরির ক্ষেত্রেই ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

কেন বদল জরুরি বলে মনে করছে প্রশাসন

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে H-1B ভিসা বার্ষিক সীমা ছাড়ালে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে এই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। সমালোচকদের দাবি, বহু ক্ষেত্রেই জুনিয়র বা তুলনামূলক কম দক্ষ পদের জন্য H-1B ভিসা ব্যবহার করা হয়েছে।

যদিও নিয়ম অনুযায়ী মজুরি দমন বা আমেরিকান কর্মীদের স্থানচ্যুতি রোধে সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, তবু অভিযোগ, অনেক সংস্থা অভিজ্ঞ কর্মীদেরও নিম্ন বেতন স্তরে দেখিয়ে এই ব্যবস্থার ফাঁক গলিয়েছে।

টেক জায়ান্টদের দাপট, ক্যালিফোর্নিয়ার আধিপত্য

পরিসংখ্যান বলছে, বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিই H-1B ভিসার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। চলতি বছরে সর্বাধিক H-1B অনুমোদন পেয়েছে অ্যামাজন-১০ হাজারেরও বেশি। এর পরেই রয়েছে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS), মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও গুগল। ভৌগোলিক দিক থেকে ক্যালিফোর্নিয়াতেই সবচেয়ে বেশি H-1B কর্মী কাজ করেন।

বর্তমানে H-1B ভিসার বার্ষিক সীমা ৬৫ হাজার, এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ হাজার ভিসা সংরক্ষিত থাকে মার্কিন মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের জন্য।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া, নজরে ভবিষ্যৎ প্রভাব

নতুন নিয়ম কার্যকর হবে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এবং আগামী H-1B ক্যাপ রেজিস্ট্রেশন চক্রেই তা প্রযোজ্য হবে।

এই নীতিকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সমর্থকদের মতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে H-1B অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি মার্কিন সংস্থাগুলিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখে।

অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, এই কর্মসূচি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রকৃত অর্থে বিশেষায়িত ও উচ্চ পর্যায়ের চাকরির বদলে বহু ক্ষেত্রেই কম অভিজ্ঞ পদের জন্য ভিসা ব্যবহার করা হচ্ছে।

নতুন ওয়েটেড সিস্টেম সেই বিতর্কের মাঝেই আমেরিকার অভিবাসন নীতিতে এক নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা হচ্ছে—যার প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে দক্ষ পেশাদারদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।

Advertisements